আজ : ২৫শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
Breaking News

লোপাট বন্যার ৬৫ লাখ টাকার রিলিফ

কুড়িগ্রাম জেলার ৫ উপজেলার ১০ ইউনিয়নে দুদফায় বরাদ্দকৃত ২০৫ মেট্রিক টন রিলিফের চাল লোপাটের চাঞ্চল্যকর খবর পাওয়া গেছে। বরাদ্দকৃত এসব চালের সরকারি মূল্য ৬৫ লাখ ৬০ টাকা।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নকে ম্লান করে দিচ্ছেন কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধি।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বন্যার কারণে কুড়িগ্রাম জেলার ৯ উপজেলার ঘরে ঘরে যখন খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট বিরাজ করছে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করছেন। তখন কুড়িগ্রামে জি আর (জেনারেল রিলিফ/খয়রাতি চাল) বরাদ্দের পুরোটাই লোপাট করার অভিযোগ দুঃখজনক।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ চাল লোপাটের সাথে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে চিলমারী, উলিপুর, ফুলবাড়ী, রাজারহাট ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ও ১০ ইউপি চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিন স্বাক্ষরিত গত ২৩ জুনের বরাদ্দ পত্রে চিলমারী উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউপিতে ১৫ মেট্রিক টন, চিলমারী সদর ইউপিতে ১ মেট্রিক টন, উলিপুর উপজেলার ধরনীবাড়ী ইউপিতে ২ মেট্রিক টন, ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ও নাওডাঙ্গা ইউপিতে ১০ মেট্রিক টন করে ২০ মেট্রিক টন এবং রাজারহাট উপজেলার রাজারহাট সদর ইউনিয়নে ১০ মেট্রিক টন জিআর এর চাল বরাদ্দ দেয়া হয়।
গত ২৯ জুন অপর এক বরাদ্দ পত্রে ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ও নাওডাঙ্গা ইউপিতে ১৫ মেট্রিক টন করে ৩০ মেট্রিক টন, উলিপুরের হাতিয়ায় ২ মেট্রিক টন, চিলমারীর নয়ারহাটে ২ মেট্রিক টন, রানীগঞ্জে ১ মেট্রিক টন, ভুরুঙ্গামারী উপজেলার পাইকেরছড়া ও পাথরডুবী ইউপিতে ২০ মেট্রিক টন করে ৪০ মেট্রিক টন জিআর চাল বরাদ্দ দেয়া হয়।
ঈদুল ফিতরের আগে সরকার ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে জনপ্রতি ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করে। এই ডামাডোলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইউপি চেয়ারম্যান ও পিআইওরা এ বিপুল পরিমাণ রিলিফের চাল আত্মসাৎ করেন।
কাগজে-কলমে এ চাল বিতরণ দেখানো হলেও রিলিফ বিতরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ট্যাগ অফিসার, ইউপি সচিব, ইউপি মেম্বার এবং উপকারভোগী কেউ জিআরের চাল বিতরণের ঘটনা জানেন না।
ফুলবাড়ীর নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসেন আলী জানান, এ ইউনিয়নে দুদফায় বরাদ্দ পাওয়া ২৫ মেট্রিক টন জিআরের চালের পুরোটাই লোপাট করা হয়েছে। রিলিফের এক ছটাক চালও দারিদ্র মানুষের হাতে পৌঁছেনি।
নাওডাঙ্গা ইউপি’র ট্যাগ অফিসার আব্দুস ছাত্তার ও শিমুলবাড়ী ইউপির রিলিফ বিতরণের দায়িত্ব প্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার (সংযুক্ত রিলিফ অফিসার) একরামুল হক জানান, তারা ওই ৫০ মেট্রিক টন জিআরের চাল বিতরণ সম্পর্কে কোন তথ্য জানেন না। তারা বিতরণ শিটে স্বাক্ষরও করেননি।
এদিকে পিআইও সবুজ কুমার গুপ্ত দাবি করেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় জিআরের চাল বিতরণ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত মাস্টাররোল এখন তার হাতে। ট্যাগ অফিসার ও ইউপি সচিবকে অবহিত না করে কেনো বিতরণ দেখানো হলো তা জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক মো. আব্দুল আউয়াল বলেন, দুই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ২৬ ও ৩০ জুন স্বাক্ষর করে ৫০ মোট্রক টন জিআর চাল গোডাউন থেকে উত্তোলন করেন। প্রতিটন চালের সরকারি মূল্য ৩২ হাজার টাকা।
রাণীগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল ইসলাম তার ইউনিয়নে দুদফায় ৩০ মেট্রিক টন জিআর বরাদ্দ পাওয়ার কথা প্রথমে অস্বীকার করেন। পরে বরাদ্দপত্রের কথা উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন, ভিজিএফ এর চালের সাথে এসব বিতরণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ট্যাগ অফিসার আব্দুল হামিদ ও ইউপি সচিব আবু বকর সিদ্দিক এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
চিলমারী সদর ইউনিয়নে বরাদ্দ ১৫ মেট্রিক টন চাল সম্পর্কে কোন তথ্যই জানেন না ট্যাগ অফিসার জাহিদ হোসেন আনছারী।
নয়ারহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান দাবি করেন, ভিজিএফের ৪ মেট্রিক টন চালের সঙ্গে তিনি জিআর ২০ টন চাল বিতরণ করেছেন। তবে এ দাবির সাথে দ্বিমত পোষণ করেন ট্যাগ অফিসার সাখোয়াত হোসেন ও ইউপি সচিব মফিদুর রহমান।
চিলমারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সিরাজ উদ্দৌলা জানান, জিআর বিতরণের মাস্টাররোল তার হাতে আছে। এর বাইরে কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
উলিপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সাজিনুর রহমান জানান, ৪০ টন জিআর চাল ঈদের আগে ভিজিএফের চালের সাথে বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু ধরনীবাড়ী ইউনিয়নের সচিব মাহামুদুল হাসান রানু দাবি করেন, এখানে জিআরের ২০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়নি। এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য ইউনিয়ন পরিষদে নেই।
রাজারহাট ও চিলমারী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার জানামতে জিআরের চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।’
ভুরুঙ্গামারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রবিউল ইসলাম জানান, জিআরের ৪০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে মর্মে চেয়ারম্যানরা কাগজপত্র দাখিল করেছেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে গিয়ে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। ট্যাগ অফিসার ও ইউপি সচিবরা এ বিষয়ে অবগত নন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মোত্তালিব মোল্লা জানান, জেলা প্রশাসক জিআর বরাদ্দে ৫টি শর্ত যুক্ত করে দিয়েছেন। এসব শর্ত পূরণ হলো কিনা জেলা পর্যায় থেকে মনিটরিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই।
তিনি বলেন, জিআরের চাল বিতরণ করা হয়েছে কিনা সেসব তথ্য এখনও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আসেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.