আজ : ৭ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২৪শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Breaking News

বিএনপির ওপর চাপ বাড়ছে তবে এখনই সিদ্ধান্ত নয়

জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে বিএনপির ওপর ভেতর ও বাইরে থেকে চাপ বাড়ছে। গত বুধবার রাতে ২০-দলীয় জোটের বৈঠকে এবং পরদিন বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার মতবিনিময় সভায়ও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে এ বিষয়ে বিএনপি দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে যাচ্ছে না।
দলীয় সূত্র জানায়, জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে বিএনপির ভেতর থেকে দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর প্রচ্ছন্ন চাপ আছে। কিন্তু এত দিন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সামনে এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়নি। এখন পরপর দুটি আলোচনায় খালেদা জিয়া নিজেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন।
এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করার লাভ-লোকসান নিয়ে শুরু থেকেই বিএনপির ভেতরে পক্ষ-বিপক্ষ ছিল, আছে। বিষয়টি ব্যক্তিপর্যায়ে ছিল, এখন প্রকাশ্যে এসেছে।
তবে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার সিদ্ধান্ত হোক বা না হোক, সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় একটি বৃহত্তর কনভেনশন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এই কনভেনশনে তারা সরকারি দলকেও আমন্ত্রণ জানাবে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো কী হবে, তা বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করবেন বিএনপির চেয়ারপারসন। এ জন্য তিনি বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন।

জাতীয় ঐক্যের জন্য আওয়ামী লীগ জামায়াতকে ছাড়ার শর্ত দিলে বিএনপি কী করবে, এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে সরকার যদি এ ধরনের শর্ত দেয়, জাতীয় স্বার্থে আলোচনা সাপেক্ষে বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।’

জানা গেছে, জামায়াতকে অপছন্দ করে বিএনপির এমন অংশটি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান সামনে রেখে সমঝোতার সুযোগটি নিতে চায়। তবে তারা সরাসরি জামায়াতকে জোট থেকে বের না করে কনভেনশনের মাধ্যমে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, জাতীয় ঐক্য গড়ার সুবিধার্থে যদি জামায়াতকে ছাড়তে হয়, তা করতে হবে। তবে এটি বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয় নয়, জাতীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। এ জন্যই আলোচনা শুরু হয়েছে।

বছর দেড়েক ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড এবং ১ জুলাই গুলশানে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি সম্প্রতি জাতীয় ঐক্যের ডাক দেয়। এ লক্ষ্যে একটি কনভেনশন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।

বিএনপির নেতারা বলছেন, এই মুহূর্তে দেশের মূল সমস্যা উগ্রবাদ। এটি জাতীয় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে এর উত্থানের জন্য বর্তমান সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, দুঃশাসন ও গণতন্ত্রহীনতা দায়ী। এই অবস্থায় জঙ্গিবাদের কবলে পড়া দেশকে বাঁচাতে দলমত-নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্য গড়া দরকার। দলটি সম্ভাব্য ঐক্য প্রক্রিয়ায় সমমনাদের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অন্য ঘরানার দলগুলোকে সম্পৃক্ত করতে চায়, যাতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ অংশ না নিলেও কনভেনশন একটি জাতীয় বা বৃহত্তর রূপ পায় এবং সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, এ সংকটে জাতীয় ঐক্যের ডাক আসা উচিত ছিল সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু ঐক্যের ডাক দিয়েছেন খালেদা জিয়া। কথা হচ্ছে, উদ্যোগটি কে নেবে—সরকার, না বিএনপি? তিনি বলেন, সরকার উদ্যোগ নিলে বিএনপি তাতে সাড়া দেবে। আর বিএনপি নিলে সরকারের অবস্থান কী হবে, তা পরিষ্কার নয়।

জানা গেছে, এসব বিবেচনা করে কনভেনশনের প্রস্তুতিপর্বেই বিএনপির পক্ষ থেকে এমন একটা আবহ তৈরির কৌশল নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রগতিশীল দল ও ব্যক্তি এবং সরকারের অংশীদারদের মধ্যে এমন বার্তা যায় যে বিএনপি জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে মানসিকভাবে প্রস্তুত আছে। এ কৌশল থেকে সম্ভাব্য কনভেনশনে জামায়াতকে বাইরে রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এর জন্য আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া আশা করছে বিএনপি।

এরই মধ্যে পরপর দুটি বৈঠকে বিএনপির জাতীয় ঐক্যের আহ্বান ও কনভেনশনের পথে বিপত্তি হিসেবে আলোচনায় আসে জামায়াত। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার রাতে ২০-দলীয় জোটের বৈঠকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজেই এ আলোচনার সূত্রপাত করেন। তিনি জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য আবদুল হালিমকে উদ্দেশ বলেন, ইচ্ছা থাকলেও অনেকে জামায়াতের কারণে বিএনপির সঙ্গে আসতে রাজি হয় না। এ সময় খালেদা জিয়া গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকী ও জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রবের নাম উল্লেখ করেন।

পরদিন রাতে বিশিষ্ট নাগরিকদের বৈঠকেও জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের ধরন ঠিক করার ব্যাপারে মত দেন কয়েকজন। ওই সভায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন, ডান, বাম প্রগতিশীল সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে হলে আগে বিএনপিকে এটি ঠিক করতে হবে যে তারা জামায়াতের সঙ্গে কোন প্রক্রিয়ায় সম্পর্ক রাখবে। জামায়াতের এখনকার প্রজন্মকে ১৯৭১ সালে তাদের পূর্বসূরীদের কৃতকর্মের জন্য মাফ চাইতে হবে। তা না হলে জামায়াতকে আলাদা রেখে ১৯৯১ সালের আদলে কাজ করতে হবে। বৈঠক সূত্র জানায়, জামায়াত ইস্যুতে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট আইনজীবী রফিক-উল হক। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে বলেছি জামায়াত ছাড়তে। এর বেশি কিছু বলব না।’

জামায়াত এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। দলটির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, জামায়াতের নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার রাতে তাঁরা এ ব্যাপারে আলোচনায় বসেছেন। বিএনপির চূড়ান্ত পদক্ষেপ দেখে দলীয়ভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জামায়াতের নীতিনির্ধারকেরা।

তবে জামায়াতের মধ্যম সারির একজন নেতা গতকাল নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মনে হচ্ছে শেষ আঘাতটা মিত্রদের পক্ষ থেকেই আসছে। এতে জামায়াত হতাশ নয়। কারণ, আদর্শিক জায়গা থেকেই আমাদের সব সময় সর্বাবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন শত নাগরিক কমিটির প্রধান অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, গুলশান হামলার পর জাতীয় স্বার্থে জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য। এই অপরিহার্য ব্যাপারটা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হলে জামায়াতকে সরে আসতে হবে। বাস্তবতা বুঝে জামায়াতও সরে এসে এ প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে। তবে এটা চূড়ান্ত নয়। এর জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.