আজ : ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
Breaking News

তোলপাড় নাছিরের বক্তব্যে

ঘুষ না দেওয়ায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে বরাদ্দ কম দেওয়া হয়েছে_ মেয়র আ জ ম নাছিরের এমন বক্তব্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে দিনভর চলে আলোচনা-সমালোচনা। অভিযোগ গুরুতর জানিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীও সাংবাদিকদের বলেন, এটি তদন্ত করে দেখা হবে। এদিকে নাছিরকে তার বক্তব্যের প্রমাণ দাখিল করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সাত দিনের সময় দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, মেয়রের অভিযোগ মিথ্যা নয়। সরকারের উচিত যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া, সত্য উদ্ঘাটন করা। তবে কাজটা কঠিন।

বুধবার চট্টগ্রামে এক সভায় নাছির অভিযোগ করেন, কর্মকর্তাদের ৫ শতাংশ হারে ঘুষ দিলে তিনি ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা সরকারের কাছ থেকে থোক বরাদ্দ পেতে পারতেন। ঘুষ না দেওয়ায় তাকে মাত্র ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প পাসের জন্য যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা তার কাছে একটি পাজেরো জিপও ঘুষ হিসেবে দাবি করেছিলেন।

গতকাল কোরবানির বর্জ্য অপসারণ বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী প্রকৌশলী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে স্থানীয় সরকার বিভাগে নির্ধারিত বৈঠক ছিল। বৈঠকে দেশের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়ররা অংশ নেন। বৈঠক শেষে

সমকালের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের মেয়রের অভিযোগ সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মন্ত্রী বলেন, ‘এ ধরনের বক্তব্য তিনি দিয়েছেন কি-না তা আগে দেখতে হবে।’ এ সময় নাছিরের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি দাবি করেন, ‘বিষয়টি আমি এভাবে বলিনি।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, ‘আমি কখনও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ঘুষ দিইনি। কোনো কর্মকর্তা আমার কাছে প্রকল্প পাস করানো বা থোক বরাদ্দ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ঘুষও দাবি করেননি।’ প্রায় একই ধরনের কথা বলেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন। তিনি বলেন, ‘আমার কাছেও কখনও মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা ঘুষ বা গাড়ি দাবি করেননি।’ নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘আমার কখনও এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি।’ তবে তিনি চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, তার অভিযোগ তদন্ত করে দেখা উচিত।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ সমকালকে বলেন, ‘একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যখন এ ধরনের অভিযোগ করেন, নিশ্চয় তা অমূলক কিংবা ভিত্তিহীন নয়। এটাই তো চলছে, তিনি মিথ্যা বলেননি। শুধু খোলাখুলি বলেছেন। সরকারের উচিত হবে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। যেসব প্রকল্প আটকে আছে তা পাস করানোর ব্যবস্থা করা।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক, চট্টগ্রামের সভাপতি অধ্যাপক সিকান্দার খান বলেন, ‘নাছির আওয়ামী লীগ দলীয় মেয়র। আবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় যিনি চালাচ্ছেন তিনিও আওয়ামী লীগের। মেয়রের এই বক্তব্যে সত্যতা আছে বলে আমি মনে করছি। এখন মন্ত্রণালয়কেই খুঁজে বের করতে হবে কারা কমিশন ছাড়া কাজ করেন না। তবে আমলারা বিষয়টি সহজভাবে নেবে না। তাই এই সত্য উদ্ঘাটন করাও সরকারের জন্য কঠিন হবে।’

এদিকে চিঠি ইস্যুর আগে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব আবদুল মালেক সাংবাদিকদের বলেন, ‘পরিষ্কার কথা, তাকে অবশ্যই ব্যাখ্যা দিতে হবে। তিনি যা বলেছেন, আমরা তার কাছে জানতে চাইব, প্রমাণ চাইব। প্রমাণ দেবেন, মন্ত্রণালয়ের কোন কর্মকর্তা তার কাছে জিপ চেয়েছেন। তিনি একজন রাজনৈতিক নেতা ও মেয়র। সুতরাং তিনিই প্রমাণ করুন। আমরা আজই তার কাছে ব্যাখ্যা চাচ্ছি।’

এরপরই তড়িঘড়ি করে শুরু হয় আ জ ম নাছিরকে জবাব চেয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া। এরপর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (নগর উন্নয়ন) জ্যোতির্ময় দত্ত স্বাক্ষরিত আদেশ জারি করা হয়। মেয়রকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রকল্প অনুমোদন এবং বরাদ্দ পেতে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘুষ চান; মন্ত্রণালয়ের জনৈক যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা আপনার কাছে একটি নতুন পাজেরো জিপ চেয়েছেন। ৫ শতাংশ ঘুষ দিলে আপনি ৮০ কোটি টাকার পরিবর্তে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেতেন ইত্যাদি তথ্য উল্লেখ করে ১০ আগস্ট চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউট (টিআইসি) মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন মর্মে ১১ আগস্ট বিভিন্ন পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। আপনার আনীত এ অভিযোগসমূহ গুরুতর। এতে মন্ত্রণালয় তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, যার প্রমাণ প্রদান আবশ্যক। এ পরিপ্রেক্ষিতে কোন কর্মকর্তা, কোথায়, কখন আপনার কাছে ঘুষ দাবি করেছেন, কে কোথায় কখন পাজেরো জিপ চেয়েছেন, কোন প্রকল্পের অর্থ ছাড়ে কোন কর্মকর্তা জটিলতার সৃষ্টি করেছেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখপূর্বক উপযুক্ত প্রমাণ আগামী সাত দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে দাখিল করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’ সন্ধ্যায় ফোনে যোগাযোগ করা হলে মেয়র নাছির জানান, তিনি কোনো চিঠি পাননি।

এদিকে কোন কর্মকর্তা বা কোন যুগ্ম সচিব মেয়রের কাছে ৫ শতাংশ অর্থ বা পাজেরো জিপ চেয়েছেন সেই বিষয়টিই গতকাল সচিবালয়ে আলোচনার শীর্ষে ছিল। কর্মকর্তাদের ধারণা, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় বা পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা এমন ইঙ্গিত মেয়রকে দিয়ে থাকতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের কাজের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাই এই সন্দেহের শীর্ষে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা দক্ষিণ সিটির একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, সিটি করপোরেশনের কোনো প্রকল্প পাস করাতে গেলে বা যে কোনো কাজ করাতে গেলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের খুশি করা নতুন কিছু নয়। অনেক দিন ধরেই এমনটা চলে আসছে।

কেন এমন ক্ষুব্ধ নাছির :আ জ ম নাছির উদ্দীন সিটি মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার এক মাস পর ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য এক হাজার ৬৩২ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে ৯৭২ কোটি টাকা ছিল সরকারের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত অর্থবছরে সরকারের কাছ থেকে চসিক পেয়েছে মাত্র ২২৮ কোটি ৮০ লাখ ৫৯ হাজার ২৯৫ টাকা, যা প্রত্যাশার মাত্র ২৩ শতাংশ। সরকারের অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে ব্যাহত হয়েছে উন্নয়ন কার্যক্রম। এ কারণে মন্ত্রণালয়ের ওপর ক্ষুব্ধ চসিক। মন্ত্রণালয়ও সন্তুষ্ট নয় চসিকের কাজে। তাই চসিক যে প্রকল্প নিচ্ছে, তা পাস করাতে গড়িমসি করছে তারা।

বরাদ্দ মিলছে না যেসব প্রকল্পে :জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরীতে নতুন খাল খনন প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০১৪ সালের জুন মাসে। দুই বছর পার হলেও প্রকল্পের কোনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি চসিক। তাদের দাবি, মন্ত্রণালয় থেকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না পাওয়ায় আটকে আছে খাল খনন প্রকল্প। ৩২৭ কোটি টাকার এ প্রকল্পে গত অর্থবছরে বরাদ্দ মিলেছে মাত্র তিন কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ১ শতাংশ। অথচ প্রকল্পটির ভূমি অধিগ্রহণেই এককালীন বরাদ্দ প্রয়োজন ২২৪ কোটি টাকা। আগামী বছরের জুন মাসে শেষ হবে প্রকল্পটির মেয়াদ। নগরের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অ্যাসফল্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রকল্প নেয় চসিক। প্রকল্পটি অনুমোদন হয় গত বছর। কিন্তু ২০০ কোটি টাকার প্রকল্পের বিপরীতে গত অর্থবছরে বরাদ্দ পেয়েছে মাত্র এক লাখ টাকা! ফলে বিদ্যমান অ্যাসফল্ট প্ল্যান্ট দিয়ে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে হিমশিম খাচ্ছে সিটি করপোরেশন। এদিকে, পরিচ্ছন্ন নগর গড়তে ১ আগস্ট থেকে ডোর টু ডোর বর্জ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করেছে সিটি করপোরেশন। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে গত জুলাইয়ে চারটি পদের বিপরীতে অস্থায়ী ভিত্তিতে দুই হাজার ৩৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। এর মধ্যে শ্রমিক দুই হাজার, পরিদর্শক ১৭ জন, সুপারভাইজার ১১ জন ও দলপতি সাতজন। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না নিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ায় নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করার নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেয় মন্ত্রণালয়। গত ৩১ জুলাই পাঠানো পৃথক চিঠিতে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করায় সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (যুগ্ম সচিব) কাজী মোহাম্মদ শফিউল আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

খাল খননের প্রকল্পেই চাওয়া হয় কমিশন :প্রকল্পের অর্থছাড়ে ৫ শতাংশ কমিশন ও এক যুগ্ম সচিব নতুন প্রকল্প পাসের জন্য চান পাজেরো জিপ_ গত বুধবার চট্টগ্রাম নগর সংলাপ অনুষ্ঠানে মেয়র এমন মন্তব্য করলেও প্রকল্পের নাম উল্লেখ করেননি তিনি। গতকাল এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে করপোরেশনের অন্যান্য কর্মকর্তা জানান, নতুন খাল খনন প্রকল্পের অর্থ পেতেই এমন কমিশন চাওয়া হয়েছিল। প্রসঙ্গত, বহদ্দারহাটের বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্পে ৩২৭ কোটি টাকার মধ্যে গত অর্থবছরে বরাদ্দ মিলেছে মাত্র তিন কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ১ শতাংশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.