আজ : ২৫শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
Breaking News

জেএমবি’র বরিশালের দুই শীর্ষ নেতার হদিস নেই

মো : নুরে আলম মান্না : আনসার উল¬াহ বাংলা টিম, হরকাতুল জিহাদ, জেএমবি, কালেমায় জামাত, হিযবুত তাহরির, আল মারকাজুল ইসলাম, আল¬¬াহর দল, হরকাতুল জেহাদ, আহলে হাদিস, হিযবুত তাওহীদ নামের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা নিরাপদ এলাকা হিসেবে নদীবেষ্টিত বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে অতীত সময়ে অসংখ্যবার ঘাঁটি গেড়ে বসতে নানাতৎপরতা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। এসব জঙ্গি সংগঠনের নাম ভিন্ন ভিন্ন হলেও তাদের কার্যক্রম প্রায় একই সূতায় গাঁধা। ফলে চারদলীয় জোট সরকারের সময় তাবলিগ জামাতের বেশে জেএমবি’র শীর্ষ নেতা বাংলা ভাই বরিশালের একটি মসজিদে এসে তিনদিন অবস্থান করেছিলো। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নির্ভরযোগ্য একটি গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, জেএমবি’র বোমা বিশেষজ্ঞ আফগানফেরত যোদ্ধা হান্নান উদ্দিন, জেএমবি’র আরেক শীর্ষ নেতা (বাংলা ভাই পর্যায়ের) আত্মঘাতী দলের প্রশিক্ষক মাওলানা মহিউদ্দিন ফারুকী, আনসারুল¬াহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীম আনসারী ও কালেমায়ে জামাত সংগঠনের আমীর আব্দুল মজিদের গ্রামের বাড়ি বরিশাল অঞ্চলে হওয়ায় বিভিন্ন সময় জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় শক্ত অবস্থান নেয়ার চেষ্ঠা করে আসছে। ফলশ্র“তিতে খোঁদ বরিশাল মহানগরীর কাউনিয়া থানার ভাটিখানা এলাকার সৈকত ভিলায় অবস্থান নিয়েছিলো কালেমায় জামাত নামের একটি জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে পুলিশ ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে ১০ নারী ও পুরুষকে গ্রেফতার করেছিলো। সূত্রটির দাবি, প্রতিটি জঙ্গি সংগঠন পরিচালনার নেপথ্যে জামায়াতের যোগসূত্রের প্রমান রয়েছে। সূত্রমতে, পুলিশ প্রশাসনের বিশেষ নজরদারিতে কৌশলে এসব জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা বিভিন্ন সময় সংঘঠিত হওয়ার চেষ্ঠা করলেও বরাবরেই তাদের পরাজিত হতে হয় দক্ষিণাঞ্চলের চৌকস আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে। জীবনবাঁজি রেখে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন সংগঠনের অসংখ্য জঙ্গিদের গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরণ করলেও আইনের ফাঁক ফোকর পেরিয়ে ওইসব জঙ্গি নেতারা জামিনে বেরিয়ে কৌশলে আবার তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।সর্বশেষ মাদারীপুরে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরিরের সদস্য ফাইজ্জুল¬াহ ফাহিমের দেয়া স্বীকারোক্তি মতে বরিশালের এক আইনজীবীর চেম্বারে বৈঠক করেছে সে (ফাহিমসহ) ছয়জন জঙ্গি সদস্য। ওই বৈঠকে আইনজীবীর দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী মাদারীপুরের শিক্ষক রতন চক্রবর্তীকে হত্যার টার্গেট নেয়া হয়। ফলশ্র“তিতে চলতি বছরের ১৮ জুন মাদারীপুরে ফাহিমসহ জঙ্গিদের হামলার শিকার কলেজ শিক্ষক রতন চক্রবর্তী গুরুতর আহত হয়েও ভাগ্যক্রমে জীবনে রক্ষা পান। ওই হামলার ঘটনায় জনতার হাতে আটক জঙ্গি ফাহিম পুলিশের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। বন্দুকযুদ্ধের পর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে মাদারীপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন বলেছিলেন, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ফাহিম জানিয়েছে শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীকে হত্যার উদ্দেশ্যে বরিশালের এক আইনজীবী নেপথ্যে থেকে কাজ করছে। তাদের পরবর্তী টার্গেট হচ্ছে বরিশাল জেলা। দীর্ঘদিনেও সেই আইনজীবীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া নিহত ফাহিমের সহযোগী অধিকাংশ জঙ্গি সদস্যরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এরমধ্যে বরিশাল নগরী, ভোলা ও বরগুনার একাধিক মন্দিরের পুরোহিতদের চিঠি দিয়ে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। সচেতন নাগরিকদের মতে, জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয় আইনজীবীদের দেয়া পরিকল্পনায় টার্গেটকিলিং মিশন বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে হুমকির চিঠি দিয়ে প্রশাসনকে মন্দির মুখী করে অন্যকোন স্থানে হামলার পরিকল্পনা করছে জঙ্গি সদস্যরা। সূত্রমতে, বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট সরকারের প্রথমার্ধে কয়েকটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে হতাহত ও মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনার মধ্যদিয়ে বরিশালে আত্মপ্রকাশ করে উগ্রপন্থি জঙ্গী সংগঠন হিযবুত তাওহীদ। সারাদেশে ওই সংগঠনের প্রশিক্ষিত সদস্য সংখ্যা রয়েছে প্রায় ২০ হাজার। হিযবুতের বরিশাল, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও ঝালকাঠী জেলার দলত্যাগী সাবেক আমীরের (জেলার গৌরনদী উপজেলার বাসিন্দা) দেয়া তথ্য অনুযায়ী, হিযবুত তাওহীদ জঙ্গি সংগঠন। আগে বুঝতে পারি নাই এরা ধর্মীয় অনুভূতির সরলতার সুযোগ নিয়ে জঙ্গি তৎপরতায় উদ্বুদ্ধ করে। যখন বুঝতে পেরেছি তখন আনুষ্ঠানিকভাবে তওবা করে দলত্যাগ করেছি। এদলে প্রশিক্ষিত আত্মঘাতী দলের অসংখ্য নারী সদস্য রয়েছে। এছাড়া হিযবুত তাওহীদের সাথে সরাসরি জামায়াতের যোগসূত্র রয়েছে।সূত্রে আরও জানা গেছে, বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার চেঙ্গুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা (দীর্ঘদিন খুলনার ফুলতলা এলাকায় বসবাসরত) দুর্র্ধষ শিবির নেতা পরবর্তীতে আফগান যোদ্ধা সর্বশেষ জেএমবি’র আত্মঘাতী দলের প্রশিক্ষক মাওলানা মহিউদ্দিন ফারুকীকে ২০০৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বরিশাল কোতোয়ালী থানা পুলিশ খুলনা থেকে গ্রেফতার করে বরিশালে নিয়ে আসেন। রহস্যজনক কারণে এক মাসের ব্যবধানে শীর্ষ এ জঙ্গি নেতা জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে যায়। মহিউদ্দিন ফারুকীকে গ্রেফতারের পর ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের কেন্দ্রীয় নেতা দাবি করে চারদলীয় জোট সরকারের বিশেষ মহলের আশ্বাসে একটি টিম বরিশালে এসে জেএমবি’র আত্মঘাতী দলের প্রশিক্ষক মাওলানা মহিউদ্দিন ফারুকীকে জামিনে মুক্ত করে নিয়ে যায়। সূত্রমতে, ভয়ঙ্কর এ জঙ্গি নেতাকে (মহিউদ্দিন ফারুকী) ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলা মামলায় শোন এ্যারেস্ট করা হলেও পরবর্তীতে তৎকালীন সময়কার জোট সরকারের উচ্চ মহলের চাঁপের মুখে পুলিশ চার্জশীট থেকে তার নাম বাদ দিতে বাধ্য হয়। অপর আফগানফেরত যোদ্ধা ও জেএমবি’র বোমা বিশেষজ্ঞ হান্নান উদ্দিনের বাড়ি বরিশাল সদর উপজেলার কড়াপুর গ্রামে। চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে একাধিকবার সে নিজ গ্রামে এসেছিলো।অনুসন্ধানী সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের সাগরপাড়ের জেলা বরগুনার নিভৃত পল¬ী থেকে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় বিভিন্ন সময় আটককৃত শতাধিক জঙ্গি সদস্যরা বর্তমানে জামিনে রয়েছে। আবার এদেরমধ্যে অনেকে এসব মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে এখন প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করায় এলাকাবাসির মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠা রয়েই গেছে। সচেতন মহলের মতে, জঙ্গি সদস্যরা গ্রেফতারের পর আইনের ফাঁক ফোকর পেরিয়ে সহজে জামিন পেয়ে যাচ্ছে। ফলে জঙ্গি দমনে প্রচলিত আইন প্রয়োগ না করে নতুন আইন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সূত্রমতে, তৃতীয়বারের ন্যায় (২০১৩ সালের ১২ আগস্ট) বরগুনায় শহরের উপকন্ঠ খেজুরতলা থেকে বৈঠকরত অবস্থায় আনসারুল¬াহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীম আনসারীসহ ৩১ জঙ্গিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই ৩১ জনের মধ্যে মুফতি জসীম আনসারী ব্যতিত বাকি সবাই রয়েছেন জামিনে। এরপূর্বে ২০০৪ সালে সদর উপজেলার নিভৃত পল¬ী নলটোনা ইউনিয়নের শিয়ালীয়া মাদরাসায় জঙ্গি প্রশিক্ষণের সময় ৩৩ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিলো। এসব জঙ্গির অনেকেই ২০০৫ সালের দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলায় জড়িত ছিলো। গ্রেফতার হওয়া এসব জঙ্গির অধিকাংশরাই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। আর অল্প কয়েকজন পরবর্তীতে স্বল্প মেয়াদের শাস্তি ভোগ করে জামিনে বেরিয়েছে। এরপূর্বে ১৯৯৭ সালের ৩ ফেব্র“য়ারি বরগুনা সদর উপজেলার ধুপতী গ্রামের আরাবীয়া এমদাদুল উলুম হাফিজিয়া কওমি মাদরাসা থেকে তিন তালেবান প্রশিক্ষককে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই মাদরাসায় প্রায় ৫০জন ছাত্র ও অন্যান্য জঙ্গিরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। ঝালকাঠিতে জেএমবি’র বোমা হামলায় নিহত সহকারি জজ জগন্নাথ পাড়ে হত্যা মামলার অন্যতম আসামি এবং আনসারুল¬াহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীম আনসারীর বাড়ি বরগুনা হওয়ায় জঙ্গিদের তৎপরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ওই এলাকার সচেতন মহল। এরইমধ্যে বরগুনার একাধিক মন্দিরের পুরোহিতদের হত্যার হুমকি দিয়ে প্রেরিত চিঠি নিয়ে আবারও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে সাগর পাড়ের বরগুনার সাধারণ মানুষের মধ্যে। সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১৪ আগস্ট গভীর রাতে ঝালকাঠীর নলছিটি উপজেলার কামদেবপুর কওমী মাদ্রাসা থেকে গোপন বৈঠকের সময় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজী) নয়জন সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এসময় তাদের কাছ থেকে একটি গ্রেনেড, চারটি রামদা, ডায়েরী, সাতটি মোবাইল ফোন ও জেহাদী বই উদ্ধার করা হয়। একইদিন বিকেলে পটুয়াখালী শহরের ছোট চৌরাস্তা এলাকা থেকে পুলিশ উগ্রপন্থি জঙ্গি সংগঠনের তিনজনসহ গত এক বছরে দক্ষিণের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা থেকে উগ্রপন্থি জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাওহীদের প্রায় শতাধিক সদস্যকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত প্রত্যেক জঙ্গি সদস্যরাই এখন জামিনে রয়েছে।আটক জঙ্গিদের জামিনে বের হওয়া প্রসঙ্গে বরগুনার অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আখতারুজ্জামান বাহাদুর বলেন, আটক জঙ্গিরা যাতে বিচারিক আদালত থেকে জামিনে বের হতে না পারে সেজন্য আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করি। কিন্তু তারা যখন বিচারিক আদালত থেকে জামিনে বের হতে না পারে তখন উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়ে জামিন নিয়ে আসে। এক্ষেত্রে আমাদের করার কিছুই থাকে না। এ ব্যাপারে বরগুনার পুলিশ সুপার বিজয় বসাক পিপিএম বলেন, বাংলাদেশের একটি উপকূলীয় জেলা বরগুনা। এ জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা দুরবস্থার কারণে অতীতে বিভিন্ন সময় জঙ্গিরা এখানে আশ্রয় নিয়েছিলো। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলোর পর জঙ্গিদের নির্মূল করতে পুরো জেলায় গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের মাধ্যমে বিভিন্নস্থান থেকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে তা যাচাই করা হচ্ছে। জঙ্গিদের অবস্থান এবং জঙ্গি তৎপরতার কোনো ধরনের তথ্য কারো কাছে থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে তা তাকে জানানোর অনুরোধ করেন। এছাড়াও ঘরভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়াদের সম্পর্কে সকল তথ্য যাচাই বাছাই করে ঘর মালিকদের ঘরভাড়া দেয়ার জন্যও তিনি অনুরোধ করেন। পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের প্রতি অভিভাবকদের বিশেষ খেয়াল রাখার জন্যও আহবান করেন। বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি মোঃ হুমায়ুন কবির জানান, বর্তমানের সার্বিক বিষয় মাথায় রেখে দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিটি জেলায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, যেকোন ধরনের নাশকতা মোকাবেলার জন্য পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব-৮’র সদস্যরা এবং গোয়েন্দা পুলিশ সর্বদা মাঠে কাজ করছেন। ফলে কোন অপরাধী এ অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারবেনা বলেও তিনি উলে¬খ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.