আজ : ৩০শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৬ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
Breaking News

জিম্মি সিন্ডিকেটে সব কিছু

সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দফতর, অধিদফতর আর সেবা খাত। ওয়াসা, ডেসা, রাজউক, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, সিটি করপোরেশন, এলজিইডি থেকে শুরু করে সার আমদানি ও ধান-চাল ক্রয়, টেন্ডারবাজি সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। তাদের সঙ্গে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একইভাবে মাঠ পর্যায়ে অর্থাৎ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংসদ সদস্যদের আলাদা আলাদা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে ঠিকাদারি থেকে শুরু করে সব ধরনের কাজ। অনেক সময় বিভিন্ন পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিরাও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক সেজে বসেন। ফলত সাধারণ ব্যবসায়ীকে অসহায় হয়ে পড়তে হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের ভর্তুকির সার নিয়ন্ত্রণ করছে একজন এমপির নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট। এরাই সারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, যা থেকে তাদের আয় হয় শত কোটি টাকা। পরিণামে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে সার পান না। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) তদন্তে উঠে এসেছে এই সিন্ডিকেটের কথা। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে ওই দলের নেতাকেই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেওয়া হয়। বিসিআইসির সাম্প্রতিক এক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার ভর্তুকি দেওয়ার পর দেশে উৎপাদিত প্রতি বস্তা টিএসপি সার এক হাজার ১০০ টাকায় এবং ডিএপি সার এক হাজার ২৫০ টাকায় কৃষকদের হাতে পৌঁছার কথা। কিন্তু শক্তিশালী সিন্ডিকেট খোলা বাজারে প্রতি বস্তা টিএসপি এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৬৫০ টাকা আর ডিএপি এক হাজার ৮০০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করছে। তাই কৃষকরা সরকারের ভর্তুকি মূল্যের সুফল পান না। শুধু তাই নয়, সার পরিবহনের ক্ষেত্রেও চলছে সিন্ডিকেশন।

বর্তমানে জোরেশোরে চলছে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান। গত বছরের মতো এবারও স্থানীয় পর্যায়ে সংসদ সদস্যদের সিন্ডিকেটই নিয়ন্ত্রণ করছে অভিযান। গত বছরের তুলনায় এবার আরও বেশি কোমর বেঁধে নেমেছেন এমপিদের অনুসারী দলীয় লোকজন। যাদের ধান-চাল ব্যবসার সঙ্গে কোনো রকম সম্পর্ক নেই তারাই এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন। যার ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন, আর প্রান্তিক কৃষকরা অসহায় সিন্ডিকেটের দাপটে। জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধান-চাল সংগ্রহের দায়িত্ব ভাগ-বাটোয়ারা করে দেওয়া হয়েছে দলীয় নেতা-কর্মীদের। এ জন্য তাদের কাছ থেকে টনপ্রতি কমিশনের পরিমাণও বেঁধে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দলীয় তহবিলের নামে বেঁধে দেওয়া এই কমিশনের হার নির্ধারণ করেছেন মাঠ পর্যায়ে দলীয় সংসদ সদস্যরা। অথচ সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কার্ডধারী কৃষক ও বৈধ চালকল মালিকদের কাছ থেকে ধান-চাল কেনার কথা খাদ্য বিভাগের। সেই নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা ধান-চাল সরবরাহ করছেন আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষক। গত বছর বোরো মৌসুমে একইভাবে দলীয় নেতা-কর্মীদের দিয়ে ধান-চাল সংগ্রহ করতে গিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। তখন অভিযোগ ওঠে, কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই গত মৌসুমে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান-চাল সরবরাহ করে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা। একই কায়দায় এ বছরও সরকারদলীয় এমপিদের টোকেন আর আধা-সরকারি লেটারের মাধ্যমে এমপিরা তাদের কর্মী-সমর্থক ও অনুসারীদের ভাগবাটোয়ারা করে দিয়েছেন ধান-চাল সংগ্রহের দায়িত্ব।

গত ২৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত খাদ্য পরিধারণ কমিটির সভায় চলতি বোরো মৌসুমে মোট ১৩ লাখ মেট্রিক টন ধান ও চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর মধ্যে ধান হচ্ছে সাত লাখ মেট্রিক টন ও ছয় লাখ মেট্রিক টন চাল। গত ৫ মে থেকে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। একইভাবে এলজিইডির বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রেও সিন্ডিকেট জেঁকে বসে। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে এলজিইডির বিভিন্ন কাজে ঠিকাদাররা জিম্মি হয়ে পড়েন সিন্ডিকেটের হাতে। স্থানীয় পর্যায়ে সংসদ সদস্যদের লোকজনই এসব সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। আবার সরকারি কর্মকর্তারাও জড়িয়ে পড়েন এসব সিন্ডিকেটে। তাদের সবার যোগসাজশে চলে অনিয়ম। টিআর-কাবিখা প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে লুটপাট, অনিয়ম, দুর্নীতির অপকর্মও সাধিত হচ্ছে সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই। কখনো কখনো সংসদ সদস্যরা এসব ঘটনায় সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন আবার কখনো তাদের ছেলেমেয়ে, নিকটাত্মীয় ও দলের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ঘটাচ্ছেন। হাটবাজার ইজারা, জলমহাল, বালুমহাল বরাদ্দের খাত থেকে শুরু করে বাস-ট্রাক টার্মিনাল এমনকি টেম্পোস্ট্যান্ডের চাঁদাবাজির টাকাও পাঠানো হচ্ছে সিন্ডিকেটের নামে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ডিসিসি উত্তর ও দক্ষিণ, এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ওয়াসা থেকে শুরু করে তিতাস গ্যাস কোম্পানি পর্যন্ত সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে আছে। সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সচল থাকা না থাকাও নির্ভর করে সিন্ডিকেট হোতাদের মর্জির ওপর। এসব সংস্থার ঠিকাদারি ও সাপ্লাই বাণিজ্যের নামে সিন্ডিকেট সদস্যরা দফতরে ঢুকে গোটা কার্যক্রমকেই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বাড়ির প্ল্যান পাশ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সংযোগ, গ্যাস সংযোগ, পানির লাইন লাগানো, এসব সংস্থার সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করাসহ সব ক্ষেত্রেই তাদের সম্মতি-অসম্মতির প্রয়োজন পড়ে। কোনো কোনো দফতরের বড় কর্মকর্তাও কোনো না কোনো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আসলে দুর্নীতিটা হয় যোগসাজশে। রাজনৈতিক নেতা, সরকারি আমলাসহ একাধিক গোষ্ঠী এই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে যারা ক্ষমতাবান তারা তাদের অবস্থান থেকে নিজেদের সুবিধা অর্জনের উপায় খোঁজে। তারা মনে করেন, এটা তাদের ন্যায্য পাওনা। তিনি বলেন, সেবা খাত, সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড যেখানে সরকারি অর্থ ব্যয় হয়, সেখান থেকেই সুবিধা পাওয়ার জন্য তারা যোগসাজশ করেন। এর কারণ হচ্ছে যারা এসবের সঙ্গে জড়িত তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার দৃষ্টান্ত বিরল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.