আজ : ২৬শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
Breaking News

আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিচমকে ভরা

আওয়ামী লীগের সভাপতি পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন শেখ হাসিনা। এ নিয়ে তিনি অষ্টমবারের মতো এ দায়িত্ব পেলেন। অন্যদিকে দলটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন ওবায়দুল কাদের। এছাড়া প্রেসিডিয়ামের ১৪ সদস্য, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক পদে ৪ জন এবং কোষাধ্যক্ষের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। রোববার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে কাউন্সিল অধিবেশনে নতুন কমিটির নেতাদের নাম ঘোষণা করা হয়। দলের বিদায়ী কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনার নাম প্রস্তাব করলে তা সমর্থন করেন অপর প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। বিদায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নতুন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাব করলে তা সমর্থন করেন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক। কাউন্সিলররা সবাই এই প্রস্তাব সমর্থন করেন। ফলে কোনো ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি।

সভাপতি পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কাউন্সিলরদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আপনারা আমাকে আবারও দলের দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি মাথা পেতে নিয়েছি। আশা করি নতুন কমিটির নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আরও শক্তিশালী হবে। ২০১৯ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের সব কার্যক্রম চলবে।’ নতুন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আওয়ামী লীগকে আরও শক্তিশালী করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে আশা করি। বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সৈয়দ আশরাফ আমার আপন ভাইয়ের মতো। শহীদ পরিবারের সন্তান হিসেবে মনপ্রাণ দিয়ে আওয়ামী লীগকে ভালোবেসেছেন। দলের জন্য কাজ করেছেন। অনুষ্ঠান শেষ করে সম্মেলনস্থল ত্যাগ করার আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক আশরাফকে জড়িয়ে ধরেন।

রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনের রুদ্ধদ্বার মিলনায়তনে দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের এ নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়া বাইরে থেকে মাইকে শোনা যায়। এই প্রথমবারের মতো মিলনায়তনের বাইরে মাইকের ব্যবস্থা ছিল। তাই পুরো প্রক্রিয়াটি অপেক্ষমাণ নেতাকর্মীরা শুনতে পান। মাইকে নেতা নির্বাচিত হওয়ার খবর শুনে তারা মুহুর্মুহু করতালি দেন। এ সময় সারা দেশ থেকে আগত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা উদ্যানে অবস্থান করেন। শাহবাগ, টিএসসি এবং মৎস্য ভবন এলাকাতেও আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে। তারা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে দলের নবনির্বাচিত সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ প্রেসিডিয়াম সদস্যদের অভিনন্দন জানান।

বিদেশে থাকাকালে ১৯৮১ সালের সম্মেলনে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮৭, ১৯৯২, ১৯৯৭, ২০০২, ২০০৯ ও ২০১২ সালে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ওবায়দুল কাদের ১৯৯৬ সালে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিলুপ্ত জাতীয় সংবাদপত্র ‘দৈনিক বাংলার বাণী’তে সহকারী সম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতায়ও যুক্ত ছিলেন। ২০০৭ সালে, ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জরুরি বিধিতে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটান এ নেতা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ২০০৯ ও ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত দলের জাতীয় সম্মেলনে প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আবদুল জলিলের কমিটিতে ওবায়দুল কাদের ছিলেন প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। সম্মেলন পরবর্তী সময়ে তিনি যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হন। আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তার এপিএসের ঘুষ কেলেংকারিতে পড়ে দফতরবিহীন হওয়ার পর রেল মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করেন ওবায়দুল কাদের।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামে সাত নতুন মুখ : সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করার পর প্রেসিডিয়াম সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়। সংশোধিত গঠনতন্ত্রে প্রেসিডিয়ামের সদস্য করা হয়েছে ১৯ সদস্যের। রোববার তিনটি পদ ফাঁকা রেখে সভাপতি শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়ামের ১৪ সদস্যের নাম ঘোষণা করেন। পদাধিকার বলে সভাপতি শেখ হাসিনা ও নতুন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রেসিডিয়ামের সদস্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। ঘোষিত প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সাতজনই নতুন মুখ। পুরনোদের মধ্যে বহাল রয়েছেন ৭ জন। এ ৭ জন হলেন- সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, কাজী জাফরউল্লাহ ও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। নতুন এসেছেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সাবেক শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক নুরুল ইসলাম নাহিদ, সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক কর্নেল (অব.) ফারুক খান, সাবেক কৃষি ও সমবায় সম্পাদক ড. আবদুর রাজ্জাক, সাবেক দফতর সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান, ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা রমেশ চন্দ্র সেন ও যশোর জেলা আওয়ামী লীগের নেতা পীষুষ কান্তি ভট্টাচার্য। বাদ পড়েছেন সদ্য বিলুপ্ত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন ও শতীষ চন্দ্র রায়। অবশ্য প্রেসিডিয়ামের ৩টি সদস্য পদ এখনও শূন্য রয়েছে।

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক : বিদায়ী কমিটির তিনজনই নতুন কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন। তারা হলেন- মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি ও জাহাঙ্গীর কবির নানক। গঠনতন্ত্র সংশোধন করে এবার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদের সংখ্যা ৪টি করা হয়েছে। নতুন সৃষ্ট চার নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদটি পেয়েছেন বিদায়ী কমিটির সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান। এ পদে আবদুর রহমান নতুন। বিদায়ী কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের কোষাধ্যক্ষ এইচএন আশিকুর রহমান নতুন কমিটিতে একই পদ পেয়েছেন। ৮১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বাকি পদগুলো শিগগির ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়।

এর আগে সকালে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। মধ্যাহ্ন বিরতির পর বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত করে নির্বাচন কমিশনের হাতে দায়িত্বভার তুলে দেয়া হয়। এর আগে দলের কাউন্সিলে দলের ঘোষণাপত্র অনুমোদন ও গঠনতন্ত্রের প্রয়োজনীয় সংশোধনী পাস হয়। দুই পর্বের রুদ্ধদ্বার কাউন্সিল অধিবেশনে বিভিন্ন সাংগঠনিক জেলার ৩৫ জন নেতা বক্তৃতা করেন। সম্মেলনের প্রথমদিনের দ্বিতীয় অধিবেশনে বক্তৃতা করেছিলেন বিভিন্ন বিভাগের পক্ষে আরও ৬ জন জেলা নেতা। সব মিলিয়ে ৭৩টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৪১টি জেলার নেতা বক্তৃতা করেন। রোববার দুপুরের বিরতির পর অধিবেশনে বক্তব্য দেন ৮ জেলার নেতা।

বিকাল পৌনে ৫টায় আওয়ামী লীগের পুরনো কমিটি বিলুপ্ত করা হলে মঞ্চ থেকে নেমে কাউন্সিলর সারিতে বসেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এরপর নেতা নির্বাচন করতে মঞ্চে ওঠেন তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন। এ তিনজন হলেন- অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, ড. মশিউর রহমান ও রাশেদুল আলম। আওয়ামী লীগের ১৯তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর। ওই সম্মেলনে শেখ হাসিনা সভাপতি ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

বিদায়ী ভাষণে কাউন্সিলরদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনারা আমাকে আজীবন নেতৃত্ব দিতে বলেছেন। এটা সম্ভব নয়। আমি তো মনে করি আপনারা আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, আমি তা পূরণ করেছি।’ তিনি বলেন, ‘দলকে দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় এনেছি। তিনবার সরকার গঠন করেছি, তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছি। আপনারা আমাকে সম্মান দিয়েছেন। আমি মনে করি, আমার কাজ শেষ।’ এ সময় উপস্থিত কাউন্সিলররা সমস্বরে ‘না-না-না’ বলতে থাকেন।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ও স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানা ৪ বার দলটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ৪ বার সাধারণ সম্পাদক এবং প্রতিষ্ঠার সময়ে কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদে নির্বাচিত হন। এছাড়া অন্যান্য সভাপতির মধ্যে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ৪ বার, এএইচএম কামারুজ্জামান ২ বার এবং আবদুর রশীদ তকর্বাগীশ ও আবদুল মালেক একবার করে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া জিল্লুর রহমান ৫ বার, শামসুল হক, তাজউদ্দীন আহমদ, আবদুর রাজ্জাক ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ২ বার এবং সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও আবদুল জলিল একবারের জন্য সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে নাটকিয়তা : বুধবার আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকের পর খবর ছড়িয়ে পড়ে দলের নতুন সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন ওবায়দুল কাদের। পরের দিন বৃহস্পতিবার এ খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গণমাধ্যমও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। শুক্রবার রাজধানীর প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বিদেশী অতিথিদের সম্মানে নৈশভোজ শেষে বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গণমাধ্যমের খবরের পরিপ্রেক্ষিতে জানান, নেতা কে হবেন তা সভাপতি শেখ হাসিনা ও তিনিই শুধু জানেন। নতুন কমিটিতে চমক থাকছে বলেও জানান সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে ডেকে পাঠান সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও ওবায়দুল কাদেরকে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথকভাবে এ দু’নেতার সঙ্গে কথা বলেন। এরপরই দৃশ্যপট পাল্টে যায়। রাতে আবারও খবর ছড়িয়ে পড়ে ওবায়দুল কাদেরই সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন। আর কেউ নন, খোদ সৈয়দ আশরাফুল ইসলামই রোববার বিকালে কাউন্সিল অধিবেশনে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাব করেন।

গণভবনে ওবায়দুল কাদের : সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর ওবায়দুল কাদের রোববার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গণভবনে যান। এ রিপোর্ট লেখার সময় রাত ৮টায় তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন। জানা গেছে, গণভবনে উপস্থিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাদের নতুন সাধারণ সম্পাদককে মিষ্টিমুখ করান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.