আজ : ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৩রা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Breaking News

‘হবিগঞ্জের শাহেদ’ খ্যাত প্রতারক আফজাল গ্রেপ্তার

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি : বিচারপতি, মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার, নৌ বাহিনীর কমান্ডারের সাথে ছবি তুলে ফেইসবুকে প্রচার করেন তিনি। নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি হিসাবে পরিচিত করে প্রতারণার ফাঁদ পাতেন ওই যবক। শাহ আফজাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ওই যুবক ভিআইপিদের সাথে ছবি দেখিয়ে এলাকায় প্রচার করে বঙ্গভবন, গণভভন ও সচিবালয়ে তার অবাধ যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে। যে কোন কাজ তিনি করে দিতে পারেন। কোন কোন স্থানে তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসাবেও প্রচার করেন। সিলেট থেকে ঢাকায় ডমেস্টিক ফ্লাইটে ভ্রমণ করে সেই ছবিও মাঝে মাঝে পোস্ট দিয়ে নিজের অবস্থান জানান দেয় আফজাল।

আর সাধারণ মানুষ এই ছবি দেখে বিশ্বাস করে শাহ আফজাল এর মাধ্যমে সব কাজই সম্ভব। ফলে বিভিন্ন লোকজন ঠিকাদারী কাজ, চাকরি, নিবন্ধন পরীক্ষায় পাশ, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন এবং বিদেশের ভিসা পেতে লাখ লাখ টাকা দেয় তাকে। কিন্তু টাকা দেয়ার পর কোন কাজ না করে টাকা হাতিয়ে নেয়। টাকা ফেরত চাইলে পাল্টা হুমকি দিয়ে বলে বিচারপিত তার আত্মীয়। বড় বড় কর্মকর্তারা তার পকেটে। বাড়াবাড়ি করলে তিনি ফাঁসিয়ে দেবে। ফলে প্রতারিত হয়েও কেউ মুখ খোলেনি তাঁর বিরুদ্ধে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি ওই প্রতারকের। প্রতারণার অভিযোগে পুলিশের হাতে বন্দি হয়ে এখন তিনি আছে কারাগারে।

সর্বশেষ হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসকের বাংলোতে বন্ধুদের নিয়ে গোপনে প্রবেশ করে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে ধরা পড়ে আফজাল। অবশ্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে মুচলেকা প্রদান করায় পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যানের জিম্মায় তিনি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে মুক্তি পেলেও তার শেষ রক্ষা হয়নি। জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পরই বিভিন্ন প্রতারণার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানা যায়, সোমবার রাত ৮টার দিকে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে গোপনে জেলা প্রশাসকের বাংলোতে প্রবেশ করে প্রতারক আফজাল হোসেন। বাংলোতে চেয়ারে বসে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে আফজাল। রাতেই বিষয়টি নজরে আসে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসানের। পরে তার নির্দেশে প্রতারক আফজালের মোবাইল ট্রেকিং করে অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তাকে ফোন করা হলে সে ভুয়া ঠিকানা প্রকাশ করে তিনি। মঙ্গলবার দুপুরে প্রশাসনের লোকজনের নেতৃত্বে কৌশলে প্রতারক আফজাল ও তার সহযোগীদের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির করা হয়। পরে ভুল স্বীকার করে মুচলেকা প্রদান করায় তাদেরকে মুক্তি দেয়া হয়।

এদিকে প্রতারক আফজাল আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীরা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে সদর থানা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হন। আফজালের প্রতারণার শিকার বিভিন্ন গ্রামের অর্ধশতাধিক লোক অবস্থান নেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সামনে। এরই মধ্যে হবিগঞ্জ সদর থানায় প্রতারণার লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন শায়েস্তানগর এলাকার ঠিকাদার মোহাম্মদ টিপু ও রিচি গ্রামের ফারুক মিয়া।

অভিযোগে মোহাম্মদ টিপু অভিযোগে উল্লেখ করেন, সিলেট শহরে বড় ধরণের কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক আফজাল। ফারুক মিয়া তার মামলার অভিযোগে উল্লেখ করেন প্রতারক আফজল তাঁর স্ত্রীকে হাই স্কুলের নিবন্ধন পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দিবে বলে ৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।

অভিযোগ রয়েছে, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার গৌর প্রসাদ রায়ের কাছ থেকে আফজল পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে চাকরি নিয়ে দিবে বলে ৩ লাখ টাকা নেয়। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মল্লিখ সরাই গ্রামের হাশিম মিয়া নামে এক ব্যাক্তির কাছ থেকে ইংল্যান্ড প্রেরণ করবে বলে চুক্তি করে ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় তিনি। হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি শফিউল্লাহর কাছ থেকে পিস্তলের লাইসেন্স করে দিবে বলে নেয় ৬০ হাজার টাকা। এভাবে বহু লোকের সাথে প্রতারণা করেন আফজাল।

শাহ আফজাল হোসেন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার আউশপাড়া গ্রামের সাবেক মেম্বার আব্দুল হেকিমের ছেলে। তিনি হাই স্কুলের লেখাপড়া শেষ করতে পারেনি। একপর্যায়ে আনসারে চাকরি নিলেও দুর্নীতির কারণে চাকুরিচ্যুত হয় তিনি। পরে সিলেটে গিয়ে এক সাংবাদিকের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নিয়ে বড় বড় নেতাদের সাথে ছবি তোলার সুযোগ খুজতে থাকে। এভাবে সে বিভিন্ন নেতাদের কাছে চলে যায়।

হবিগঞ্জ সদর থানার ওসি মাসুক আলী জানান, শাহ আফজাল হোসেন একজন প্রতারক। তার বিরুদ্ধে চাকরি দেয়াসহ বিভিন্ন কাজ করে দেয়ার নামে টাকা নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে মামলা দায়ের করা হলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.