আজ : ২৬শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১১ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Breaking News

সাইবার সিকিউরিটি সক্ষমতা বাড়াতে হবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, ডিজিটাল সুবিধা ব্যবহার করে কেউ যেন অপরাধ কার্যক্রম চালাতে না পারে সে ব্যবস্থাও আমাদের নিতে হবে। তিনি বলেন, ডিজিটালাইজেশনের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে আর্থিক খাত এবং গোপনীয় বিষয়ের নিরাপত্তা যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বুধবার সকালে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি, বসুন্ধরায় দেশের সর্ববৃহৎ তথ্যপ্রযুক্তি মেলা ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৬’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন। ‘নন স্টপ বাংলাদেশ’ থিমকে সামনে রেখে সরকারের আইসিটি বিভাগ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের সহযোগিতায় তিন দিনব্যাপী এই মেলার আয়োজন করা হয়। সরকারের ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট প্রণয়নের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, এ বিষয়ে জনসম্পদ তৈরি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হবে। আমরা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০১৬ প্রণয়ন করতে যাচ্ছি। এর আওতায় বাংলাদেশে বিশ্বমানের ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন, সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি গঠন, সাইবার ইন্সিডেন্স রেসপন্স টিম (সিইআরটি) প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চপর্যায়ের ডিজিটাল সিকিউরিটি কাউন্সিল গঠন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত সরকার বিনা খরচে সাবমেরিন ক্যাবলে সংযুক্ত হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও নিরাপত্তার অজুহাতে তা হাতছাড়া করে। আমরা সরকার গঠন করে দেশের স্বার্থে টাকা খরচ করে সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হই। তিনি বলেন, দেশে কোনো বিকল্প সাবমেরিন ক্যাবল না থাকায় আমরা দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছি। দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলে বাংলাদেশ প্রায় ১ হাজার ৩০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ অর্জন করবে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উড্ডয়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ২০১৭ সালে এর যাত্রা শুরুর পর নিজস্ব চাহিদা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে আমরা স্যাটেলাইট ব্যান্ডউইথ রফতানি করতে পারব।

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তৃতা করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইমরান আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) ও অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) কর্মসূচির পরিচালক কবির বিন আনোয়ার, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শ্যাম সুন্দর শিকদার এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সভাপতি মোস্তফা জব্বার।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নারীদের কম্পিউটার প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের সুবিধার্থে ৬টি স্মার্ট বাসেরও উদ্বোধন করেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তার সরকার শিক্ষা খাতকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ম থেকে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত ১৭টি টেক্সট বইকে ডিজিটাল টেক্সটবুক বা ই-বুকে রূপান্তর করেছি। শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে আমরা সারা দেশে ৩০ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করেছি। সারা দেশে ২ হাজার ১টি ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব’ স্থাপন করেছি। আরও ৯০০টি ল্যাব প্রতিষ্ঠার কাজ শেষের পথে। ৬৪ জেলায় ৬৫টি ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে সাড়ে ৫ হাজারেরও অধিক ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের মধ্যে আরও ১০ হাজার ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব’ স্থাপন করা হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নয়নে আমাদের প্রচেষ্টা বিশ্ববাসীর সুনাম অর্জনে সক্ষম হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে অবদানের জন্য ‘আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০১৬’ পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। তাকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অন্যতম কারিগর আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওর কাছ থেকেই আমি কম্পিউটার চালানো শিখেছি। মা হিসেবে এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এ পুরস্কারে আমি সম্মানিত বোধ করেছি। এ অর্জন শুধু সরকারের নয়, এ কৃতিত্ব দেশের জনগণের। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের মেয়াদে আরও বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার তথ্যও তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আবার জনগণের সেবার সুযোগ পায়। আমরা সরকার গঠন করে মানুষকে উন্নত জীবনদানের প্রতিজ্ঞা করি। তারই অংশ হিসেবে আমরা টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে ঢেলে সাজাই। এ সময় তিনি বিএনপি সরকারের সময় মোবাইল ফোনের মনোপলি ব্যবসা ভেঙে দিয়ে ব্যক্তি খাতকে উন্মুক্ত করে দেয়াতেই আজ সবার হাতে মোবাইল ফোন আসতে পেরেছে বলেও উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে আমাদের সরকার বিগত সাড়ে সাত বছরে আইসিটি খাতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। আজ দেশের প্রতিটি উপজেলা ফাইবার অপটিক ক্যাবলের আওতায় এসেছে। যে ব্যান্ডউইথের দাম ২০০৭ সালে ছিল ৭৬ হাজার টাকা, তা কমিয়ে বর্তমানে মাত্র ৬২৫ টাকায় এনেছি। এরই মধ্যে প্রায় সব উপজেলা থ্রি-জি সেবার আওতায় এসেছে। আগামী ২০১৭ সালের মধ্যেই ফোর-জি চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশে আজ প্রায় ১৩ কোটির বেশি মোবাইল সিম ব্যবহৃত হচ্ছে। ৬ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ৫ হাজার ২৫০টি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজন ২০০ ধরনের ডিজিটাল সেবা গ্রহণ করছে। ৩ হাজার ডাকঘরেও ডিজিটাল সেবা দেয়া হচ্ছে। কয়েকটি উন্নত দেশসহ প্রায় ৪০টি দেশে আমরা সফটওয়্যার ও আইসিটি সেবা রফতানি করছি।

যুব সমাজের কর্মসংস্থানে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইসিটি ব্যবহার করে তরুণ জনগোষ্ঠীর আউটসোর্সিংয়ের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আমরা ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। এ প্রকল্পের আওতায় ৫৫ হাজার তরুণ-তরুণীকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এরই মধ্যে ২০ হাজার জনকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি উপার্জনের পথ সুগম করতে ‘বাড়ি বসে বড়লোক’ কর্মসূচির আওতায় ১৪ হাজার ৭৫০ জনকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন,আসুন, দলমত নির্বিশেষে সবাই মিলে সরকারের রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও উন্নত-সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলি।

প্রধানমন্ত্রী আলোচনা পর্ব শেষে মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এবারের মেলায় ৪০টি মন্ত্রণালয় ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে কী কী সেবা দিচ্ছে তার আদ্যোপান্ত তুলে ধরবে। মেলায় শীর্ষস্থানীয় শতাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের ডিজিটাল কার্যক্রম তুলে ধরবে। তিন দিনব্যাপী আয়োজনে মাইক্রোসফট, ফেসবুক, একসেন্সার, বিশ্বব্যাংক, জেডটিই, হুয়াওয়েসহ খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠানের ৪৩ জন বিদেশী বক্তাসহ দুই শতাধিক বক্তা ১৮টি সেশনে অংশ নেবেন। এছাড়া নেপাল, ভুটান, সৌদি আরবসহ ৭টি দেশের ৭ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্সে অংশ নেবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.