আজ : ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Breaking News

সম্পদের তথ্য গোপনই থাকছে

আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সংসদ সদস্যদের সম্পদের হিসাব প্রতি বছর প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়ার কথা। তবে বাস্তবতা হলো, এখন আর নির্বাচনী ইশতেহার অনুসরণ করা হচ্ছে না।

মানা হচ্ছে না প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও। তাই বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের তিন বছর পূর্ণ হতে চললেও উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্যদের সম্পদের তথ্য জমা হয়নি এবং প্রকাশ পায়নি। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে মন্ত্রী-এমপিসহ জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের তথ্য বরাবরের মতো গোপনই থেকে গেছে। তেমনি প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া একটি ভালো উদ্যোগও ফ্রিজবন্দী হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী মহাজোট সরকারের সময়ও অধিকাংশ মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য তাদের সম্পদের হিসাব জমা দেননি। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এই অঙ্গীকার পূরণ না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এটা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকারে ছিল, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও ছিল। কিন্তু বাস্তবে হয়নি। এই না হওয়াটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘জনগণের কাছে অনেক অঙ্গীকার করা হয়, বাস্তবে তার অধিকাংশই পূরণ করা হয় না। অঙ্গীকার পূরণের এই ঘাটতি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রত্যক্ষভাবে হয়তোবা অনুভব করেন না। তবে বাস্তবে দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে জনগণের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর আস্থার সংকট তৈরি হয়। ’

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দেওয়ার বিষয়টি আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির অগ্রযাত্রায় একটা ইতিবাচক বিষয় ছিল। কিন্তু তা পূরণে ঘাটতির কারণে জনগণকে আশাহত হতে হয়। ’

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মহাজোট সরকারের সময় ২০১১ সালের মার্চে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সম্পদের হিসাব বিবরণী প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এতে মন্ত্রীদের আয় ও সম্পদের বিবরণীসহ ১৭টি তথ্য দিতে বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে আয়, গৃহসম্পত্তির আয়ের অর্থ, ব্যবসার পুঁজি বা মূলধনের জের, অকৃষি জমি, অর্জিত মোট তহবিল ইত্যাদি। অবশ্য প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তাদের সম্পদ বিবরণী জনসমক্ষে কিংবা ওয়েবসাইটে প্রকাশের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত করা হয়।

ওই প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত সমমর্যাদাসম্পন্ন অথবা তুলনীয় মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, যারা সরকার অথবা প্রজাতন্ত্রের কার্যে নিযুক্ত, তারাই প্রতি বছর আয়কর জমা দেওয়ার এক মাসের মধ্যে নির্ধারিত ছকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের আয় ও সম্পদের বিবরণী জমা দেবেন। প্রধানমন্ত্রী স্বীয় বিবেচনায় আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১১ সালের মার্চে জারি করা ওই প্রজ্ঞাপন এখনো বহাল আছে। এতে কোনো পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা হয়নি। এমনকি এ বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্তও হয়নি। ওই প্রজ্ঞাপন জারির পর তৎকালীন মহাজোট সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কয়েক দফা নির্দেশনা দেওয়ার পরও অধিকাংশ মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা তাদের আয় বা সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দেননি। যদিও শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালের শেষ দিকে মন্ত্রিসভার প্রায় ২৫ জন সদস্য তাদের সম্পদের হিসাব বিবরণী সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেন। তাও আবার নবম সংসদে অংশগ্রহণের সময় নির্বাচন কমিশনে যে তথ্য দিয়েছিলেন সে তথ্যই পুনরুল্লেখ করেছেন।
বাকিরা সম্পদের বিবরণী জমাই দেননি। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ওই সময়ে একাধিকবার সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তাদের সম্পদ বিবরণী সংসদের স্পিকারের কাছে জমা দেওয়ার জন্য বলেছিলেন। তাতে খুব একটা সাড়া মেলেনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের প্রতিশ্রুতি ‘দিনবদলের ইশতেহার’-এ পাঁচ অগ্রাধিকারের অন্যতম সুশাসন প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত অনুচ্ছেদের ৫(৩)-এ বলা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতি বছর জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। ’ সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ঘোষিত ইশতেহারেও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ‘আমাদের এবারের অগ্রাধিকার : সুশাসন, গণতন্ত্রায়ন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন’ শীর্ষক অনুচ্ছেদের ১(৮)-এ দুর্নীতি প্রতিরোধ বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘নিজেদের সম্পদ, আয়-রোজগার সম্পর্কে সর্বস্তরের নাগরিকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। ’ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবারও সরকার গঠন করে।

কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য সমপর্যায়ের পদস্থ ব্যক্তিরা গত তিন বছরেও সম্পদের কোনো হিসাব দেননি বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের এই মেয়াদে মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ সমমর্যাদার ব্যক্তিদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কোনো তাগিদ না থাকায় কেউই সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দেননি। অথচ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতিই হচ্ছে সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.