আজ : ২৫শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১০ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Breaking News

বয়লার নয়, গ্যাস লাইন লিক হয়ে বিস্ফোরণ’

টাম্পাকোর ভেতর থেকে বের হচ্ছে লাশের গন্ধ, এখনোটঙ্গীর বিসিক শিল্প নগরীর টাম্পাকো ফয়েল্স কারখানার আগুন দুদিনেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি দমকল বাহিনী। দুর্ঘটনার পর থেকে এখনো নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনদের আহাজারিতে কারখানার আশে-পাশের পরিবেশ ভারি হয়ে উঠছে। গাজীপুর জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে আজ রোববার বিকেল পর্যন্ত নিখোঁজ ১১ জনের নাম তালিকাভূক্ত করা হয়েছে। কারখানার মূল ভবনের পূর্বে একটি রাস্তার পাশে ধসে পড়া ভবনটির অংশবিশেষ থেকে আজ চারটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রিপন দাস (৩৫) নামের এক ব্যক্তি। এনিয়ে ওই কারখানায় বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা ৩০ জনে দাঁড়ালো।

এদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের বয়লার পরিদর্শক ইঞ্জিনিয়ার শরাফত আলী দাবি করেছেন, বয়লার বিস্ফোরণে নয়, গ্যাস লাইন লিক হয়ে টাম্পাকো কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

জ্বলন্ত আগুন, ক্ষতিকর ক্যামিকেল ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত উদ্ধারকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত কারখানার ভেতরে ঢুকতে পারেননি। ভেতর থেকে লাশের দুর্গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। বিসিকের প্রধান সড়ক থেকে ভবনের ধ্বংসাবশেষ অপসারণ না করায় ওই সড়কও বন্ধ রয়েছে। সেখানের ধ্বংসাবশেষের নিচ থেকেও লাশের গন্ধ বের হচ্ছে। সেখানে পথচারীরা চাপা পড়ে থাকতে পারেন বলে স্থানীয়রা ধারণা করছেন।

আজ সকাল সাড়ে ১০টায় শিল্প মন্ত্রী আমির হোসেন আমু ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

মন্ত্রী বলেন, টাম্পাকো কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আমরা মর্মাহত, শোকাহত। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। হতাহতদের পরিবার-পরিজনদের প্রতি সমবেদনা জানাই। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্বাস্থ্য মন্ত্রাণালয়ের পক্ষ থেকে আহতদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে আর্থিক সাহায্য দেয়া হচ্ছে। শিল্প মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুংখানুপুঙ্খ তদন্ত করে আমরা দেখব এ ঘটনা কেন ঘটল। টাম্পাকো কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যাদের গাফিলতি থাকবে, তারা যে প্রতিষ্ঠান বা যে সংস্থার হোক না কেন শাস্তি পাবেই।

মন্ত্রী বলেন, এ ঘটনার মাধ্যমে যে এতগুলো প্রাণ গেল এজন্য আমরা খুবই দুঃখিত। শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্দেশ দিয়েছি সব শিল্প নগরীতে এধরনের কারখানায় তদন্ত করার। দেখা হোক কোথাও কোনো লিকেজ ও বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট আছে কি না? বয়লার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে কিনা? মেয়াদ উত্তীর্ণ কোনো বয়লার চালু আছে কিনা? এসময় নিখোঁজদের আত্মীয়স্বজনরা মন্ত্রীর সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ধ্বংসস্তুপ সরানোর পর তালিকা করে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। সরকার নিহতদের আর্থিক সহায়তা এবং আহতদের চিকিৎসা সেবা দেবে।

এসময় স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. জাহিদ আহসান রাসেল, শিল্প মন্ত্রণালয় সিনিয়র সচিব মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া, বিসিক চেয়ারম্যান মো. হযরত আলী, গাজীপুর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন-অর-রশিদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোলায়মান, সহকারী পুলিশ সুপার মো. বেলায়েত হোসেন, শিল্প পুলিশের সুপার শোয়েব আহম্মেদ উপস্থিত ছিলেন।

টাম্পাকো ফয়েলস কারখানার ভবনের নিচতলা এবং ৪ ও ৫ তলা থেকে আজও ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা পানি দিয়ে ধোঁয়া নেভানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে দুপুর ১২টার দিকে বৃষ্টি নামে।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লে. কর্নেল মোশারফ হোসেন বলেন, আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিস বিরামহীন কাজ করে যাচ্ছে। ভবনের ভাঙা অংশের কারণে পানি সব স্থানে পৌঁছানো যাচ্ছে না। যেখানে পুনরায় আগুন বা ধোঁয়া উঠছে সেখানেই আমরা পানি দিচ্ছি। দমকল বাহিনীর কোনো ইউনিটকেই প্রত্যাহার করা হয়নি। ২৫টি ইউনিটই কাজ করছে। ১০টি পাম্পের সাহায্যে সার্বক্ষণিক পানি ছিটানো হচ্ছে। কারখানার তিনটি ভবনই একসাথে ধ্বসে পড়ায় এবং সর্বত্রই কেমিক্যালের ছড়াছড়ির কারণে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সমস্যা হচ্ছে। তবে আশপাশের ভবনগুলোকে রক্ষা করতে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। যে কোনো মুহূর্তে ভবন দেবে যেতে পারে বা কেমিক্যালের কারণে আরো বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ফলে আমরা সাবধানে পদক্ষেপ নিচ্ছি। বিকেল ৪টা থেকে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করতে পারবেন বলেও জানান।

তিনি বলেন, যখন আগুন কম ছিল তখন আমরা দেখেছি, ভেতরে অনেক কাগজ, রোল মজুদ ছিল। কিছু ফয়েলও আছে। এগুলো থেকে বার বার আগুন জ্বলে উঠছে। ইতোমধ্যে বুয়েটের দুজন ইঞ্জিনিয়ার, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ইঞ্জিনিয়ার ও রাজউকের ইঞ্জিনিয়াররা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তাদের সমন্বয়ে একটি টিম তৈরি করা হয়েছে। তাদের পরামর্শে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

ওই টিমের অভিমত হলো, পাঁচতলা ভবনও যেকোনো সময় ধ্বসে যেতে পারে। তাই ফায়ার সার্ভিসের টিম যেন নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেয়। পাশাপাশি আমাদের পক্ষ থেকে সাধারণ জনগণকে পরামর্শ দেব যেন তারা নিরাপদ দূরত্বে থাকেন।

তিনি জানান, বিভিন্ন কারখানায় অ্যামোনিয়াম জাতীয় গ্যাস সংরক্ষণ করে রাখা হয়। কিন্তু এখানে এ ধরনের গ্যাস আমরা শনাক্ত করতে পারিনি। তবে এখানে এমন কিছু ক্যামিক্যাল ছিল যা বিস্ফোরণে সহায়তা করে।

রোববার ফায়ার সার্ভিসের সাথে তাদের কমিউনিটি ভলান্টিয়াররাও আগুন নেভানোর কাজ করেছেন।

কমিউনিটি ভলান্টিয়ারদের দলনেতা আব্দুর রহিম কালা জানান, শনিবার ১৬০ জন ও রোববার ৫০ জন ভলান্টিয়ার আগুন নেভানোর কাজে দমকল বাহিনীর সদস্যদেরক সহায়তা করেছেন।

কারখানার একপাশের অংশ হেলে পড়েছে। সেটার ভেতর থেকেও কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিসের বারিধারা ইউনিটের কর্মী রেজওয়ান হোসেন জানান, তাদের পুরো ইউনিট শনিবার সকাল থেকে আগুন নেভানোর কাজ করছে। এখনও ২৫টি ইউনিট কাজ করছে। তবে ভবনের মধ্যে প্রচুর কেমিক্যাল থাকায় আগুন জ্বলে উঠছে।

তিনি বলেন, কারখানাটির চারপাশে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতেও সমস্যা হচ্ছে। অন্যদিকে রাস্তার ওপর হেলে পড়া ভবনের অংশ থাকায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভালোভাবে কাজ করতে পারছেন না। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন।

হাসপাতালের ছুটি বাতিল
আহতদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা ও গাজীপুরের সব সরকারি চিকিৎসকের ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশে চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি ডিরেক্টর ডা. নাজিব আহম্মেদ জানিয়েছেন।

তিনি জানান, বর্তমানে ব্যক্তিগত সফরে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। গাজীপুরে কারখানায় দুর্ঘটনায় হতাহতদের বিষয়ে খোঁজ নিয়েছেন তিনি। আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের ছুটি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি সব সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বলেছেন।

বয়লার অক্ষত
বয়লার বিস্ফোরণে নয়, গ্যাস লাইন লিক হয়ে টাম্পাকো কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের বয়লার পরিদর্শক ইঞ্জিনিয়ার শরাফত আলী। শনিবার টাম্পাকো কারখানা পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টাম্পাকো কারখানায় দুটি বয়লার রয়েছে। এগুলো আগামী ২০১৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত নবায়ন করা আছে।

তিনি বলেন, আমরা বয়লার রুম পরিদর্শন করে দেখেছি, অগ্নিকাণ্ডের পরও কারখানার দুটি বয়লার অক্ষত আছে। তাই বয়লার বিস্ফোরণে নয়, গ্যাস লিকেজ থেকে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

কারখানার বয়লার অপারেটর ইনচার্জ ইমাম উদ্দিন বলেন, কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের কোনো আশঙ্কাই নেই। আমরা বয়লার রুমে গিয়ে দেখেছি বয়লার দুটি এখনও অক্ষত আছে। তবে গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে কারখানায় গ্যাস লাইনে লিকেজ সৃষ্টি হয়েছিল। সে কারণে হয়তো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টাম্পাকো কারখানায় মোট চারটি বয়লার ছিল।

তবে প্রতিষ্ঠানটির এ কর্মকর্তা দাবি করছেন দুটি। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে ওই কারখানায় দুটি বয়লারের অনুমোদন রয়েছে।

কারখানায় সরকারিভাবে গ্যাস ব্যবহারের অনুমোদন ছিল ১০ পিএসআই। কারখানার বয়লার এবং জেনারেটর গ্যাসের সাহায্যে চলতো। এ দুর্ঘটনার পর থেকে কারখানার আশপাশের এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে তিতাস কর্তৃপক্ষ।

ধ্বংসস্তুপ অপসারণ শুরু
আজ বিকেল ৪টার পর থেকে ধ্বসে পড়া টাম্পাকো কারখানা ভবন অপসারণের কাজ শুরু করা হয়েছে বলে জানান গাজীপুর জেলা প্রশাসক এস এম আলম।

তিনি জানান, ফায়ার সার্ভিসের দুই শতাধিক কর্মী ধ্বসে পড়া কারখানা ভবনের ডামপিং কাজ শুরু করেছেন।

এদিকে, পাঁচতলা ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। এটি যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলে ফায়ার সার্ভিস ঢাকা বিভাগীয় উপ-পরিচালক মো. মোজাম্মেল হক জানান।

ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক জহিরুল আমিন মিয়া রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুরোপুরি নিভে গেলে ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.