আজ : ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৩রা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Breaking News

বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হোন : প্রধানমন্ত্রী ‘

‘আমি নিজ হাতেই সুইচ বন্ধ করি, আপনারাও করুন’

বিদ্যুৎ-গ্যাসের অপচয় না করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন যেমন ব্যয়বহুল তেমনি সময়সাপেক্ষ। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য আমি সবাইকে অনুরোধ জানাব।

মঙ্গলবার সকালে বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে ‘জাতীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সপ্তাহ-২০১৬’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘আমি চাই, অভিভাবক-শিক্ষক থেকে শুরু করে সবাই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়,

অফিস, আদালত- সর্বক্ষেত্রেই আপনারা সাশ্রয়ী মনোভাব নিন অর্থাৎ বিদ্যুতের সুইচটি একটু নিজেই অফ করেন। আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও ঘর থেকে বের হওয়ার সময় নিজ হাতেই বিদ্যুতের সুইচটা বন্ধ করে দেই। কাজেই আমি চাই, প্রত্যেকের মাঝেই এ মানসিকতাটা থাকতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের চলমান গতি অব্যাহত রাখার মাধ্যমে আমাদের রূপকল্প-২০২১ অনুযায়ী আগামী ২০২১ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ দিতে পারব। এ কাজের অংশ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট, ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত আট বছরে ৮০টি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে মোট সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ ৯ হাজার ৮৯৩ সার্কিট কিলোমিটার এবং বিতরণ লাইনের পরিমাণ ৩ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন নেপালের জ্বালানিমন্ত্রী জনার্দন শর্মা এবং বিদ্যুৎ, জ্বলানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তাজুল ইসলাম এমপি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। শুভেচ্ছা বক্তৃতা করেন জ্বলানি এবং খনিজ বিভাগের সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরী ও বিদ্যুৎ বিভাগের সবিচ মনোয়ার ইসলাম। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ ও জ্বলানি খাতে বিশেষ অবদানের জন্য ২টি ক্যাটাগরিতে অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিতরণ করেন।

অনুষ্ঠানে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বলানি খাতের অগ্রগতিভিত্তিক একটি তথ্যচিত্রও পরিবেশিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ৯ হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৮টি কয়লাভিত্তিক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এছাড়াও আমরা রূপপুরে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। আগামী ২০২৪ সাল নাগাদ নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে ২২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত নতুন তিনটি গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্যাসের গড় উৎপাদন দৈনিক ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দৈনিক ২ হাজার ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে। ৮৫৪ কিলোমিটার নতুন গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ, সারকারখানা, শিল্প, বাণিজ্যিক ও আবাসিক খাতে বর্তমানে প্রায় ৩৪ লাখ গ্রাহকের কাছে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৯টি নতুন গ্যাস স্ট্রাকচার আবিষ্কার, ১১টি অনুসন্ধান ও ৪৮টি উন্নয়ন কূপ খনন এবং ২২টি কূপের ওয়ার্কওভার কাজ স¤পাদন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে ২০২১ সালের মধ্যে আরও ৩৭টি উন্নয়ন কূপ খনন এবং ২৩টি কূপের ওয়ার্কওভার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রতিরোধে আমাদের সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘সে ডা আইন-২০১২’ এর আওতায় ‘সে ডা’ নামে একটি একক প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় ২০২১ সালের মধ্যে এ ধরনের জ্বালানি থেকে মোট বিদ্যুতের ৫ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়ছে। এ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে ২০২১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। দেশে অফগ্রিড এলাকার ৪৫ লাখ সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে, যা সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। সরকার অফগ্রিড এলাকায় সোলার মিনিগ্রিড স্থাপন, সৌর সেচ পাম্প স্থাপনসহ বড় আকারে সোলার পার্ক স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ভারত থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে এবং আরও ৫০০ মেগাওয়াট আমদানির জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নেপাল এবং ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে সরকার বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মহেশখালীতে বিল্ড-অউন-অপারেট-ট্রান্সফার (বিওওটি) পদ্ধতিতে একটি ‘ফ্লটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ বাস্তবায়নাধীন আছে। এই ‘এফএসআরইউ’ প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার এলএনজি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এবং দৈনিক প্রায় ৫০০ এমএমএসসিএফ গ্যাস সরবরাহ ক্ষমতাসম্পন্ন হবে। তিনি বলেন, এ টার্মিনাল থেকে প্রাপ্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্যে মহেশখালী-আনোয়ারা ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ৯১ কিলোমিটার গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

আগামী ২০১৮ সালে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভিশন-২০২১ এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কয়েকটি ল্যান্ড বেসড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭ শতাংশ, যা বিগত আট বছরে ১ কোটি ১৪ লাখ নতুন সংযোগ প্রদানের মাধ্যমে ৭৮ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে। এতে দেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষ নতুন বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। তিনি বলেন, দেশের সব মানুষের জন্য বিদ্যুৎ সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে পল্লী বিদ্যুতের মাধ্যমে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন হয়েছে। আলোচনা পর্ব শেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.