আজ : ২৭শে মে, ২০১৮ ইং , ১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Breaking News

বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে মেয়েরা কিভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে

বেতন ও পদোন্নতিতে বৈষম্য
অফিস ছুটির পর মতিঝিলের একটি রেস্তরায় বসে কথা হচ্ছিল সামিনা জাবিনের সাথে। এটা তার ছদ্ম নাম। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিন বছর হল কাজ করছেন।

চোখে মুখে ইতিমধ্যে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। কারণ তার অফিসে বেতন এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে তিনি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে মনে করছেন। তিনি বলছিলেন ” আমি আড়াই বছর ধরে কাজ করি আমার বেতন ১৩ হাজার টাকা, কিন্তু একটা ছেলে যার পড়াশোনা শেষ হয়নি, সে জয়েন করলো, তার বেতন ১৬হাজার টাকা। আমি যখন চ্যালেঞ্জিং কাজ করতে চাই এবং কর্মকর্তাদের বলি তখন তারা বলে এটা তুমি পারবে না, তারা ছেলে কলিগদের দিয়ে করায়, বছর শেষে পদোন্নতি তারা পেয়ে যায়।

কাজের জায়গায় যৌন হয়রানি
মালিবাগে সোহানা সাবরিনের বাসায়। ছোট বাসাটি নিজের মত করে সাজিয়ে নিয়েছেন। বাসার এক কোনে লেখালেখি করার টেবিল আর চেয়ার,কাগজ-পত্রে ঠাসা। ছয়মাস হল চাকরি ছেড়েছেন। এখন ফ্রি-ল্যান্সার হিসেবে কাজ করছেন বিভিন্ন জায়গায়।
তিনি বলছিলেন “আমার বসের দাড়ায় আমি হয়রানির শিকার হয়েছি, তিনি প্রায়ই আমাকে কম্পিউটারে কাজ দেখানোর কথা বলে মাউস সহ হাত ধরতো, শরীরে টাচ করে সাথে সাথে সরি বলতো। যখন পরিস্থীতি অসহনীয় হয়ে গেল তখন আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানালাম কিন্তু তারা কিছু করলো না বরং আমি চাকরি ছাড়তে বাধ্য হলাম”।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানালে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলছেন একজন নারী
এটা হওয়ার পিছনে কারণ হিসেবে তিনি বলছিলেন “আমি ছিলাম ডিভোর্সী, এটা অফিসে জানার পরেই সমস্যগুলো তৈরি হতে থাকে। আমার মনে হয় সমাজে একটা ধারণা আছে ডিভোসী মেয়েরা একা, অসহায়। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাবে, সেই সুবিধাটা নেয়ার চেষ্টা করে অনেকে”।
চ্যালেঞ্জিং কাজে মেয়েরা কি পিছিয়ে?
মেয়েরা এখন কাজ করছে সরকারি, বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানে। যেসব কাজে পুরুষদের একাধিপত্য ছিল বলে এক সময় মনে করা হত সেসব জায়গাতেও এখন মেয়েরা কাজ করছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের সমতার জায়গা কি তৈরি হয়েছে? একটি বেসরকারি সংস্থাতে কাজ করছেন তাবাস্সুম। তিনি বলছিলেন একটা বড় কাজের সুযোগ থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয় শুধু তিনি বিবাহিত এই কারণ দেখিয়ে।
তাবাস্সুম বলছিলেন “আমাকে বলা হল আপনি বিবাহিত এখন তো বেশি সময় দিতে পারবেন না। তাই কাজটি আমরা অমুককে( ছেলে) দিয়েছি। আমি মনে করি সেই কাজটা করার সম্পূর্ণ যোগ্যতা আমার ছিল” ।

নানা সময়ে প্রতিবাদ হয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে
সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ৮০% পুরুষ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর করা এক জরিপে দেখা যাচ্ছে শিল্প কারখানাগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় মেয়েরা ২০.০৩%, সরকারি-বেসরকারি চাকরীতে রয়েছেন ১২.০৮%। ‘লেবার ফোর্স সার্ভে বাংলাদেশ ২০১৩’ নামের ঐ জরিপে দেখা যাচ্ছে প্রধান নির্বাহী, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও আইনপ্রনেতা হিসেবে যারা কাজ করছেন তাদের মধ্যে মাত্র ১২.৯% মেয়ে । অর্থাৎ সহজ কথায়- প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয়ার জায়গায় প্রায় ৮০% রয়েছে পুরুষ।
কর্মজীবী নারীদের নিয়ে গড়া একটা প্রতিষ্ঠানের প্রধান রোকেয়া রফিক বলছিলেন ” নারীর সেই পরিবেশ নেই কাজ করার, তারপরে তার কাজকে স্বীকৃতি দিতে চাননা তার নিজের প্রতিষ্ঠান বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। তার সফলতা আনার জন্য, কর্মক্ষম করার জন্য যে সুযোগ সৃষ্টি বা চেষ্টা নেয়া দরকার সেটা নেয়া হয় না”।
মেয়েরা কেন কম পরিমাণে সিদ্ধান্ত নেয়ার জায়গায় রয়েছে সেটা নিয়ে যখন কথা হচ্ছে তখন কর্মপরিবেশে আরো বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা জানা গেলো।
পোষাক-আশাক নিয়ে আপত্তি

কামরুনা নাহারকে স্কুলের চাকরি ছাড়তে হয়েছিল শুধু তার পোষাক-আশাক নিয়ে কর্তৃপক্ষের আপত্তি এবং ব্যক্তি জীবন সমালোচনার জন্য।
“আমাকে বলা হল আপনি পর্দা করে আসবেন। আমি সালোয়ার-কামিজ পরি। তার পরেও চাকরি বাঁচাতে হিজাব পরলাম, এরপর আমার ব্যক্তি জীবন নিয়ে তারা আমার পিছনে কথা বলা শুরু করলো। বিষয়টা এতটাই মানসিক পীড়নের কারণ হল যে আমি কর্মস্থল পরিবর্তন করলাম”।
অভিযোগের আঙ্গুল পুরুষদের দিকে
কর্মক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়া, বেতন পদোন্নতিতে বৈষম্য, যৌন হয়রানি আর নিত্যন্তই কিছু না হলে পিছনে সমালোচনা করার অভিযোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শোনা যায়। কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের স্বস্তি দায়ক পরিবেশ না করার জন্য তাই পুরুষদের দিকেই অভিযোগের আঙ্গুলটা যায়। বিষয়টাকে তারা কিভাবে দেখেন। একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন আরিফ নুর।

তিনি বলছিলেন “ছোট বেলা থেকে একটা মেয়ে কেমন হবে সেই চিত্র পরিবার আর সমাজ থেকে শিখেয়ে দেয় আমাকে। পরে কর্মক্ষেত্রে এসে দেখি একটি মেয়ে আমার সমান অথবা আমার চেয়ে বেশি যোগ্যতা নিয়ে কাজ করছে। তখনই ধাক্কাটা লাগে। আমার অবচেতন মন আমাকে ঈর্ষান্বিত করে, আমি তাকে সমকক্ষ ভাবতে পারি না। সমস্যার শুরু এখান থেকেই”।
তবে কিছু কিছু ব্যতিক্রম ঘটনার কথা জানা যায় যেখানে মেয়েরা কর্মপরিবেশে স্বস্তি নিয়ে কাজ করছেন। তবে একটি ব্যতিক্রম ঘটনা যেমন উদাহরণ হতে পারে না তেমনি কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অসমতার বিষয়টা পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে জরিপ, গবেষণা আর কর্মজীবী মেয়েদের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.