আজ : ২২শে জানুয়ারি, ২০১৮ ইং , ১০ই মাঘ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Breaking News

দুর্দিন বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের

দেশে দেশে নানা সমস্যা পোহাচ্ছেন বাংলাদেশি কর্মীরা। চাকরিচ্যুতি, গ্রেপ্তার আতঙ্ক, কাঙ্ক্ষিত কাজ না পাওয়ায় স্বপ্নের প্রবাস অনেকের কাছে হয়ে উঠছে দুর্বিষহ। সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কুয়েত, কাতার, লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে ভালো সময় যাচ্ছে না তাদের। বৈশ্বিক রাজনীতির নানা টানাপড়েন ও স্থানীয় বাজারে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় এসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এ ছাড়া কাজের চাহিদা না থাকলেও কিছু কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি নানা ফন্দি ফিকির করে সেসব দেশে কর্মী পাঠিয়ে ভোগান্তিতে ফেলছে। অন্যদিকে অবৈধভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার পথে অনেক দেশের সীমানা পার হতে পারছে না তারা। ফলে বিদেশের মাটিতে আটকা পড়ছে এসব বাংলাদেশি। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কেই আটকা পড়েছে প্রায় ২ হাজার বাংলাদেশি। সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে তারা।
সৌদি আরবে শ্রমিকদের চাকরি হারানো সংক্রান্ত এ বছরে প্রথম ধাক্কাটি আসে ২১শে এপ্রিল। ওই দিন সৌদি প্রশাসন একটি নির্দেশিকা জারি করে যাতে বলা হয়, এখন সৌদি আরবের শপিংমলগুলোতে প্রবাসীরা চাকরি করতে পারবেন না। দেশটির নাগরিকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেয় দেশটির সরকার। এই সিদ্ধান্ত কা?র্যকর হলে সেদেশে শপিংমলে কর্মরত কয়েক হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মীর চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তারা পুনরায় চুক্তি করবে না এমনটাই জানায় দেশটির শ্রম দপ্তরের মুখপাত্র খালেদ আবাল খাইল। সৌদি ভিশন-২০৩০ অনুযায়ী, খুচরা দোকানগুলোতে ১৫ লাখ শ্রমিক রয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র ৩ লাখ সৌদি নাগরিক। এদিকে দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বাংলাদেশ ও সৌদির একশ্রেণি দালালচক্রের যোগসাজশে ফ্রি ভিসার নাম করে বাংলাদেশি কর্মীদের সেদেশে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যাওয়ার পর তারা কর্মহীনই থেকে যাচ্ছে। দালালরা অনেক সময় ভুয়া কোম্পানির নামে ভিসা দিচ্ছে। আবার এমন অনেক কোম্পানির নামে ভিসা দিচ্ছে যাদের কোনো কর্মীর চাহিদা নেই। অভিযোগ রয়েছে ওই সব কোম্পানি টাকার বিনিময়ে এসব ভুয়া নিয়োগপত্র দিচ্ছে। এতে ৬-৭ লাখ টাকা খরচ করে গিয়ে দু’পয়সা আয়-রোজগার করে দেশে পাঠানো তো দূরের কথা নিজেরাই চলতে পারছে না। মাস তিনেক আগে ফ্রি ভিসা নিয়ে দেশটিতে গেছেন মাহফুজ নামে ঝিনাইদহের এক বাসিন্দা। তিনি জানান, তাকে পাঠানো হয়েছে দেশটির ইয়েমেন সীমান্তে। এখানে কোনো কাজ নেই। মাঝে মাঝে কাজ জোটে তাও সপ্তাহে দু-তিন দিন। তা দিয়ে কোনোরকম চলি। তার মতো অনেকেই আছে সেখানে। তাছাড়া ইয়েমেন সীমান্তে প্রায়ই যুদ্ধ হয়। মাথার ওপর দিয়েও অনেক সময় গুলি চলে যায়। তাই ভয়ে বাহিরও হতে পারে না। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা কর্মী ছাঁটাই করছে। এমনই এক প্রতিষ্ঠান জেদ্দাস্থ বাংলাদেশি দূতাবাসের কাছে অবস্থিত নাদা কোম্পানি। কোম্পানিটির প্রায় ৩০০ কর্মী কর্মহীন রয়েছে। তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। সম্প্রতি এই ধরনের হয়রানির অভিযোগে দূতাবাস আবদুল কুদ্দুস নামে এক বাংলাদেশি দালালের বিরুদ্ধে মামলা করে। পরে সৌদির এক দালালের সহযোগিতায় তিনি মুক্ত হন। সম্প্রতি অস্বাভাবিক হারে কর্মী গমনের কারণ অনুসন্ধানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত একজন সচিবের নেতৃত্বে একটি দল গত এপ্রিল মাসে দেশটিতে সরজমিনে তদন্তে যান। তদন্তে তারা এসব সমস্যার সত্যতা পান বলে এক কর্মকর্তা জানান। ওই কর্মকর্তা জানান, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো যেসব কর্মী নিয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রে দূতাবাসের সত্যায়ন থাকে না। ফলে আমরা যখন এখান থেকে সমস্যায় পড়া কর্মীদের ব্যাপারে রিপোর্ট দিতে বলি তারা খুঁজে পান না।
সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় অবৈধ বিদেশি শ্রমিক ধরতে ব্যাপকভাবে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। গত ৩০শে জুন মধ্যরাত থেকে চলা এই অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার বিদেশি শ্রমিক আটক করা হয়েছে। যাদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন ৮ শ’ জন। অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা কারাম এশিয়ান দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সমন্বয়ক মো. হারুন-অর-রশিদ জানান, সারা দেশের অলিগলি, প্রতিটি শহর ও গ্রামে একযোগে অভিযান চালাচ্ছে সরকার। এতে বৈধ কাগজপত্র না থাকা বিদেশিরা আতঙ্কে রয়েছেন। এ অবৈধ বিদেশিদের তালিকার একটি বড় অংশ বাংলাদেশি নাগরিক। এর আগে গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০শে জুন পর্যন্ত অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি শ্রমিকদের বৈধকরণের জন্য সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু অনেকেই এ সুযোগ গ্রহণে ব্যর্থ হয়। দেশটির অভিবাসন কর্মকর্তারা জানান, তারা নতুন করে আর কোনো সুযোগ দেবে না। এদিকে ধরপাকড় শুরু হওয়ার পর বিপাকে রয়েছেন বৈধ কাগজপত্র না থাকা বাংলাদেশিরা। গ্রেপ্তারের ভয়ে তারা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। অনেকে নিজেদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে দালালের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েও কোনো ফল পাননি। এ ছাড়া দূতাবাসে ফোন করেও কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না এমন অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।
কুয়েতে আতঙ্কে রয়েছেন প্রায় ১০০০ বাংলাদেশি কর্মী। বকেয়া বেতন, ওভার টইম ও অবকাশকালীন পাওনা না পেয়ে স্থানীয় খৈতান ও জালিভ আল শুইয়ুখ নামের দুই কোম্পানিতে গত ২৮শে জুন থেকে ধর্মঘট শুরু করেন বাংলাদেশি হাজার খানেক শ্রমিক। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের পাওনা না পাবেন ততক্ষণ তারা কাজে যোগ দেবেন না বলে জানিয়ে দেন। ধর্মঘটের পরদিন ৮ জন ও ২রা জুলাই আরো ৯ জনকে আটক করে কুয়েত পুলিশ। এর মধ্যে নয় জনের বিরুদ্ধে পলাতক দেখিয়ে মামলা করে স্থানীয় কুয়েত কোম্পানি। শ্রমিকদের অভিযোগ, তাদের দিয়ে দাসের মতো কাজ করানো হয়। প্রতিদিন আমাদের কাজ করতে হয় ১৬ ঘণ্টা। নির্ধারিত ৮ ঘণ্টার বাইরে যে ৮ ঘণ্টা কাজ করানো হয় তার জন্য বাড়তি কোনো অর্থ আমাদের দেয়া হয় না। নিয়োগকারীরা এসব ওভারটাইমের পাওনা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিন্তু তা রক্ষা করেনি। অনেকে তিন মাস পর্যন্ত বেতন পাননি। ধর্মঘট করার পর গত সপ্তাহে প্রায় ১৫ জনকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। বাংলাদেশি শ্রমিকরা জানান, তারা এ বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন।
কাতার বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার। দেশটির বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত রয়েছেন প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি। কিন্তু নতুন শ্রম আইনে সমস্যায় পড়েছেন বাংলাদেশিরা। গত বছরের ডিসেম্বরে করা এই আইনে বলা হয়েছে, অনুমতি ব্যতীত কোনো শ্রমিককে নিয়োগদাতা অন্য কারো কাজে লাগাতে পারবেন না। এই আইন অমান্য করলে শাস্তি হিসেবে ৫০ হাজার কাতার রিয়াল জরিমানা ও তিন বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এতে দেশটিতে অভিবাসী সুবিধা মতো মালিক পরিবর্তর করতে পারছে না। সবচেয়ে বেশি বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশটিতে থাকা প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের ওপর। এদিকে কাতারের সঙ্গে সৌদি জোটের বেশ কয়েকটি দেশের সম্পর্ক ছিন্নের কারণে অনেক বাংলাদেশির মধ্যেই আতঙ্ক কাজ করছে। তারা মনে করছে এতে করে তাদের ওপর প্রভাব পড়বে। তাদেরকে চাকরিচ্যুত করা হতে পারে। তবে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কাতারে কর্মরত বাংলাদেশিদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে দেশটিতে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস। একই সঙ্গে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে তাদের। পরবর্তীতে দূতাবাস থেকে করণীয় জানানো হবে বলেও দূতাবাস থেকে জানানো হয়।
এদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায় দীর্ঘদিন আতঙ্কে রয়েছে বাংলাদেশি নাগরিকরা। কর্মস্থলে-বাসাবাড়িতে মিসাইল হামলায় এর আগে বেশ কয়েকজন মারাও গেছেন। এসব কারণে বর্তমানে দেশটিতে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু তারপরও থেমে নেই। দালালের খপ্পরে পড়ে এখনো অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এই দেশে যাচ্ছেন। গিয়ে পড়ছেন বিপাকে। কাজ না থাকায় অর্থসংকটে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দিনের পর দিন। দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, লিবিয়ার পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। বাড়ছে ছিনতাই। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই টাকা রেখেছিলেন ব্যাংকে। কিন্তু ওইসব ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় প্রয়োজনের সময় সেই টাকা তুলতে পারছেন না। ফলে আরো বেশি সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাদের।
অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টায় তুরস্কে গিয়ে আটকা পড়েছেন প্রায় ২০০০ বাংলাদেশি। তাদের নিয়ে দেশটিতে মানবিক সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আল্লামা সিদ্দিকীকে উদ্ধৃত করে সরকারি তথ্য অধিদপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে। দূতাবাস সূত্র জানায়, সামপ্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ইরান, লেবানন ও জর্ডানে বৈধভাবে কমর্রত বাংলাদেশিদের অনেকের ইউরোপে অনুপ্রবেশের আশায় তুরস্কে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু বর্তমানে তুরস্কের সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ফলে অনেকে সেখানে আটকা পড়ছেন। অনেকে ছোটখাটো কাজ করলেও তা যথেষ্ট না। দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানান, তারা এ ধরনের খোঁজ প্রায়ই পান। বিদেশের মাটিতে তাদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও সাধ্যমতো চেষ্টা করেন সহযোগিতা করার। ওই কর্মকর্তা আরো জানান, ইতিমধ্যে এমন ৩০০-৪০০ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। তারা তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। বাংলাদেশিদের ঝুঁকি নিয়ে এভাবে বিদেশ পাড়ি দেয়াকে তিনি আত্মঘাতী হিসেবে উল্লেখ করেন।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে থাকা অবৈধ বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে চাপ দেয়া হচ্ছে ইইউ’র পক্ষ থেকে। বাংলাদেশের যেসব নাগরিক ইইউভুক্ত দেশে কাগজপত্র ছাড়া বসবাস করছেন তারাও অস্বস্তিতে রয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.