আজ : ১৫ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Breaking News

প্রার্থীরা শান্ত বরিশালকে অশান্ত করছে!

বরিশাল সিটি নির্বাচনের শান্ত পরিবেশ অশান্ত করে তুলছেন প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর প্রার্থীরা। হুমকি, হামলা-পাল্টা হামলা, ইভিএম প্রশিক্ষণে বাঁধা, নির্বাচন কর্মকর্তাকে অস্ত্র দেখিয়ে ভীতির সৃষ্টি এবং ভোট কিনতে টাকাসহ ধরা পড়ার মতো ঘটনা ঘটছে গত কয়েক দিনে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মেয়র প্রার্থীসহ অপর ৫ মেয়র প্রার্থী গণমাধ্যমের কাছে এবং লিখিতভাবে রিটার্নিং অফিসারের কাছে আচরণ বিধি ভঙ্গ এবং হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ করলেও তাদের মধ্যে কোন সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। ফলে মেয়র প্রার্থীরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে গণসংযোগ, পথসভা, উঠান বৈঠক করলেও বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে টানটান উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদে।

সংঘাত সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া, আচরণ বিধি ভঙ্গসহ নির্বাচনী পরিবেশ বিঘ্নিত করার দায়ে এ পর্যন্ত ৭ জন কাউন্সিলর প্রার্থীকে শোকজ এবং অর্থদণ্ড করার কথা জানিয়েছে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়।

গত ১৪ জুলাই সন্ধ্যার পর নগরীর ১১ নম্বর ওয়ার্ডে প্রথম সংঘাতের ঘটনা ঘটে। ওই দিন স্বতন্ত্র কাউন্সিলর প্রার্থী মারুফ আহমেদ জিয়ার সমর্থকদের হামলায় ৫ বস্তিবাসী আহত হয়। এ নিয়ে বিরোধের জের ধরে আওয়ামী লীগের এক পক্ষ নৌকা প্রতীকের নির্বাচনী কার্যালয় ভাংচুর করে অপর পক্ষের উপর দায় চাপানোর চেষ্টা করে। যদিও পুলিশের তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেড়িয়ে আসে। সবশেষ গত রবিবার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সাদিক আবদুল্লাহর উঠান বৈঠকে কাউন্সিলর প্রার্থী আওয়ামী লীগ সমর্থিত মজিবর রহমান এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ ঘরানার জিয়ার সমর্থকরা নিজ নিজ পক্ষের জনসমর্থন প্রদর্শন করতে গিয়ে মারামারিতে লিপ্ত হন। নগর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে এক পর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত হলেও মেয়র প্রার্থী সাদিক আবদুল্লাহ দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর উপর রাগ করে দ্রুত উঠোন বৈঠক ত্যাগ করেন। পৃথক দুটি সংঘাতের পর ওই ওয়ার্ডে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে।

গত শুক্রবার নগরীর ১২ নম্বর ওয়ার্ডে ইভিএম প্রশিক্ষণ নিয়ে তুলকালাম কান্ড ঘটে। ওই দিন বিকেলে ওই ওয়ার্ডের নূরিয়া আইডিয়াল স্কুলে এবং কিশোর মজলিস বিদ্যালয় কেন্দ্রে ইভিএম প্রশিক্ষনে বাঁধা দেয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী জকির হোসেন ভুলু। এ সময় সে নির্বাচন কর্মকর্তাদের অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয়ভীতি প্রদানসহ ইভিএম প্রশিক্ষণ পণ্ড করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ নিয়ে ভুলু এবং প্রতিদ্বন্দ্বী হাজী কেএম শহীদুল্লাহ’র কর্মী-সমর্থকদের সাথে সংঘাত হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

এছাড়া ওই ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী হাজী সহিদের বিরুদ্ধে একজন মুক্তিযোদ্ধাসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন সমর্থকদের মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ১২নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান স্বপন বাদী হয়ে হাজী সহিদকে প্রধান আসামি করে থানায় মামলাও করেছেন।

গত রবিবার ভোরে নগরীর ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী জামায়াত নেতা সালাউদ্দিন মাসুমের ৪ সমর্থককে বেদম মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর লোকজন। সালাউদ্দিনের নির্বাচন সমন্বয়কারী মো. নাসির উদ্দিন ওই হামলার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তৌহিদুল ইসলাম ছাবিদকে দায়ী করে থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। ছাবিদও থানায় পাল্টা অভিযোগ দিলে ওই দিন সন্ধ্যায় দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয় এবং আটক ওই ৪জনকে পুলিশ ছেড়ে দেয়। ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের অপর কাউন্সিলর প্রার্থী শাকিল আহমেদ পলাশ অভিযোগ করেন, গত রবিবারের ঘটনার পর গোটা ওয়ার্ডে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

২২ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি দলীয় কাউন্সিলর প্রার্থী আ.ন.ম সাইফুল আহসান আজিমের অভিযোগ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের হুমকি ও ভয়-ভীতির কারণে তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি যথাযথভাবে প্রচারণাও চালাতে পারছেন না অভিযোগ করে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

গত রবিবার রাতে নগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের অক্সফোর্ড মিশন রোড এলাকায় জালাল ফকির নামক এক ব্যক্তিকে স্থানীয়রা নগদ ২০ হাজার ৫শ’ টাকা সহ আটক করে পুলিশে খবর দেয়। তখন জালাল ফকির পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনকে জানায়, ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আলতাফ মাহমুদ সিকদার কয়েকজন ভোটারের মধ্যে টাকা দেওয়ার জন্য তাকে পাঠিয়েছিলেন। পরে পুলিশ তাকে আটক করে। পরদিন সোমবার সকালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জালাল ফকিরকে ১৮ হাজার ৫শ’ টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে কাউন্সিলর প্রার্থী আলতাফ মাহমুদ সিকদারের দাবি, টাকাসহ আটক জালাল আওয়ামী লীগ কর্মী। সে তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাইয়েদ আহম্মেদ মান্নার লোক হিসেবে সবার কাছে পরিচিত।

গত সোমবার সন্ধ্যায় নগরীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের খান সড়ক এলাকায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মেহেদী পারভেজ খান আবিরের কর্মী মো. মুন্নাকে হাতুরী পেটা করে একই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ কর্মী জালাল সিকদার। এ ঘটনার পর জালালের বিচারের দাবিতে ওই রাতেই ওই এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে আওয়ামী লীগের একাংশ। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করেন মুন্না।

সব শেষ আজ মঙ্গলবার নগরীর ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা এসএম জাকির হোসেনের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে গিয়ে তার কর্মী সমর্থকদের লাঞ্চিত করাসহ গালাগাল এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ পাওয়া গেছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জিয়াউরি রহমান বিপ্লবের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পর ওই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে সৃষ্ট সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল বলেন, কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে সৃষ্ট ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন। ওই সব ঘটনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোন সম্পৃক্ততা নেই।

মহানগর বিএনপি’র সহ-সম্পাদক আনোরুল হক তারিন বলেন, অধিকাংশ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ভোটারদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করছে। বিষয়টি দেখার দায়িত্ব আইনশৃখলা বাহিনী এবং নির্বাচন কমিশনের।

বিসিসি নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন খান বলেন, সংঘঠিত ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে অভিযোগ পাওয়ার পর ৭ জন কাউন্সিলর প্রার্থীকে অর্থদণ্ড এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন কোন অনিয়মকে প্রশ্রয় দিচ্ছেনা বলে তিনি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.