আজ : ২৫শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১০ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Breaking News

আওয়ামী লীগের অন্তর্নিহিত সমস্যা এবং সম্মেলন

সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের মধ্যে তোড়জোড়ের অন্ত নেই। পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেল এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন সম্মেলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতি প্রকাশিত হচ্ছে- একই সাথে নেতা-নেত্রীদের ব্যস্ততার ছবিও দেখা যাচ্ছে। এবারের সম্মেলন নিয়ে দলের সব স্তরের নেতাকর্মীদের আশা-আকাক্সক্ষা অসীম। দলের বাইরের লোকজনের কৌতূহলও কম নয়। সম্মেলনকেন্দ্রিক হাঁকডাক, আলোকসজ্জা, মঞ্চ এবং প্যান্ডেলের আকার-আকৃতি দেখে স্পষ্টতই বোঝা যায়, এবারের সম্মেলনটি বেশ জাঁকজমকপূর্ণ হবে। সরকারের উন্নয়নতন্ত্রের স্লোগানের সার্থকতার একটি জ্বলন্ত ছাপ পুরো সম্মেলনে থাকবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন।

এ সম্মেলনের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- বঙ্গবন্ধু পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য কাউন্সিলর হিসেবে যোগ দিতে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের আকার-আকৃতি ও ব্যাপ্তি সম্পর্কে যাতে জনমনে কোনো বিভ্রান্তি না জন্মায় অথবা পরিবারের নাম ভাঙিয়ে যাতে কেউ কোনো অনৈতিক সুবিধা নিতে অথবা বেআইনি প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সে জন্য প্রধানমন্ত্রী বিগত নবম পার্লামেন্টে ঘোষণা দিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবিত দুই কন্যার পরিবার অর্থাৎ তাদের স্বামী-সন্তান ছাড়া আর কেউ বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্য নয়। সেই হিসাবে প্রধানমন্ত্রী নিজে, তার বোন শেখ রেহানা, প্রধানমন্ত্রী তনয়-তনয়া সজীব ওয়াজেদ জয়-সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং শেখ রেহানা তনয় রেদওয়ান ববি মুজিব কাউন্সিলর হয়ে সম্মেলনে যোগদান করবেন এমন খবরে সংশ্লিষ্ট মহলে বেশ কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।
সম্মেলনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ২২ ও ২৩ অক্টোবর ২০১৬।

২০তম জাতীয় সম্মেলন, যাকে কেন্দ্র করে নতুন একটি স্লোগানও রচিত হয়েছে। ‘উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছি দুর্বার, এখন সময় বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার’ স্লোগান তুলে ধরে সারা দেশ থেকে হাজার হাজার কাউন্সিলর ঢাকায় এসে কী কী করবেন এবং কী কী দেখবেন, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আবেগ-উৎকণ্ঠার অন্ত নেই। সবার মধ্যেই একধরনের চাপা উত্তেজনা এবং অব্যক্ত আকাক্সক্ষার ঝড় বইছে। কারণ সম্মেলনকে সামনে রেখে সবাই কিছু-না-কিছু চাচ্ছেন অথবা আশা করছেন, কিন্তু মুখফুটে কেউ কিছু বলছেন না। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি আবার দলের সভানেত্রী হতে ইচ্ছুক নন। দল যদি সভাপতির পদে নতুন কাউকে বেছে নেয়, তিনি খুশি হবেন।

আওয়ামী লীগের মধ্যে একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই মুখফুটে বলতে পেরেছেন- তিনি কী চান বা চান না। অন্য নেতারা এখন পর্যন্ত কোনো পদপদবি চাওয়া বা না চাওয়া নিয়ে টুঁ শব্দটি উচ্চারণ করা দূরের কথা, কোনো অঙ্গভঙ্গি বা আকার ইঙ্গিতের মাধ্যমেও নিজেদের মনোভাবের জানান দিচ্ছেন না। বড় বড় পদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘিরে একশ্রেণীর কৌতূহলী নেতাকর্মী নিজ নিজ পছন্দের নেতাদের পক্ষে জোর তদবির চালানোর অংশ হিসেবে দশমুখে নেতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে কোনো কোনো নেতা তার অনুসারীদের অতিরিক্ত তৎপরতার কারণে রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। এক নেতা তো বলেই ফেললেন, ‘বেশি চামচামি করে নেতাদের বিপদে ফেলো না।’

আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলনের প্রধান অন্তর্নিহিত সমস্যা হচ্ছে- কোনো স্তরের কোনো নেতার পক্ষ থেকে দলের কোনো পদ-পদবির ব্যাপারে প্রকাশ্যে নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা না করা। অন্য কথায় বলতে গেলে- আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী প্রকাশ্যে এ কথা বলার সাহস বা ক্ষমতা রাখেন না যে, আমি ওমুক পদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রতিযোগিতা করতে চাই অথবা নির্বাচিত হতে চাই কিংবা মনোনীত হতে চাই। আওয়ামী লীগের মতো প্রাচীন, বৃহত্তম এবং গণতান্ত্রিক বলে দাবিদার সংগঠনটির যেকোনো পদই সঙ্গত কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবানও বটে। স্বাভাবিক নিয়ম হলো, মূল্যবান বস্তু পাওয়ার জন্য তুমুল প্রতিযোগিতা হবে এবং তা হতে হবে প্রকাশ্যে; কিন্তু আওয়ামী লীগ এবং তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগের প্রধান সহযোগী জাতীয় পার্টির সব নেতাকর্মীই দলের পদপ্রার্থী হওয়ার নৈতিক মনোবল, ক্ষমতা ও সাহস একান্ত নিভৃতে দলীয় প্রধানের ইচ্ছার কাছে সমর্পিত করেই নিজেদের রাজনৈতিক জীবনের সার্থকতা এবং সফলতা প্রমাণের চেষ্টা করেন।

পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক থাকে তবে এ কথা নিশ্চিত, প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন আওয়ামী লীগের আবার সভানেত্রী। দলের সাধারণ সম্পাদক, প্রেসিডিয়াম মেম্বার, সাংগঠনিক সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ, প্রচার সম্পাদক এবং দফতর সম্পাদক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি একক ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। বাকি পদগুলোর ক্ষেত্রে তিনি তার পরিবার, একান্ত ঘনিষ্ঠজন এবং আপনজনদের বুদ্ধি, পরামর্শ ও সুপারিশ গ্রহণ করবেন। সম্মেলনে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে যথারীতি কথাবার্তা হবে। বিরোধী দল বিশেষত জামায়াত-বিএনপির কঠোর সমালোচনা করা হবে। আলোচনা হবে জঙ্গিবাদ দমনে সফলতা, আঞ্চলিক রাজনীতিতে বিশিষ্টতা অর্জন এবং বৈশ্বিক রাজনীতি তথা পররাষ্ট্র নীতির সাম্প্রতিক দৃশ্যমান সফলতা নিয়ে। এর বাইরে তৃণমূল থেকে আসা যারা খুব ভালো বক্তব্য দিতে পারেন, তাদের সুযোগ দেয়া হবে সভামঞ্চে বক্তৃতা দেয়ার।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা উল্লিখিত বিষয় সম্পর্কে আমার চেয়েও বেশি ওয়াকিবহাল। তারা খুব ভালো করেই জানেন, সম্ভাব্য সম্মেলনের মাধ্যমে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে। তার পরও কেন এত ব্যস্ততা? কেন এত আবেগ এবং উচ্ছ্বাস? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলেই সম্মেলনসংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা এবং দলের অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলো দৃশ্যপটে চলে আসবে। প্রথম সমস্যা হচ্ছে- বঙ্গবন্ধু পরিবারের ব্যাপ্তিসংক্রান্ত। প্রধানমন্ত্রী যতই বলুন না কেন, বঙ্গবন্ধুর পরিবার কেবল তার জীবিত দুই কন্যার পরিবারের মধ্যে সীমিত, তা শেষমেশ ধোপে টেকে না। দলের ভেতরে ও বাইরে এবং তৃণমূলে বঙ্গবন্ধু পরিবার এবং আত্মীযস্বজনের বিরাট এক প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সাথে দূরতম সম্পর্কে আত্মীয়তা রয়েছে এমন কাউকে পেলে বাংলাদেশের জনগণ তাকে আলাদাভাবে মর্যাদা দেয়। অন্য দিকে, দলের লোকজন তাকে বিশেষভাবে সম্মান ও সমীহ করে থাকেন।

মাদারীপুরের ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরীর পরিবার, গোপালগঞ্জের শেখ মনির পরিবার, বরিশালের আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবার, খুলনার শেখ নাসেরের পরিবারের বাইরে হাল আমলের বাহাউদ্দিন নাসিম এবং ইঞ্জিনিয়ার খোন্দকার মোশারফ আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর আত্মীয় হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পেয়েছেন এবং পরিবারের সদস্যদের নানামুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে দলীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন। তাদের বাদ দিয়ে যেমন আওয়ামী লীগকে কেউ কল্পনা করেন না, তেমনি তারাও বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিজেদের দলের সাথে এমনভাবে সম্পৃক্ত করে ফেলেছেন, দল ও তাদের জীবন একসূত্রে গাঁথা হয়ে গেছে। পরিবারের মধ্যে অন্তর্বিরোধ কিংবা মনোমালিন্য থাকতে পারে; কিন্তু বাস্তবতা হলো- তারা সবাই যেমন আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী, তেমনি দলটিকে যদি কোনো দিন খারাপ সময় অতিবাহিত করতে হয় তবে আওয়ামী বিরোধীদের যাবতীয় তাপ-চাপ, আক্রমণ, জুলুম-নির্যাতন প্রভৃতির বেশির ভাগের দায়ভার তাদেরই বহন করতে হবে। কাজেই তারা যেকোনো মূল্যে দলের সাথে অধিকতর গুরুত্ব নিয়ে সম্পৃক্ত হতে চাইবেন। বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়পরিজনের মধ্যে শেখ সেলিম, শেখ হেলাল, আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, লিটন চৌধুরী, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, বাহাউদ্দিন নাসিম, নিক্সন চৌধুরী আপন কর্মগুণে ইতোমধ্যে রাজনীতিতে পাকাপোক্ত স্থান করে নিয়েছেন। অন্য দিকে, প্রধানমন্ত্রী, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, শেখ রেহানা, ববি মুজিব এবং খোন্দকার মোশারফ, দল ও সরকারের ক্ষমতার কেন্দ্রে অসম্ভব প্রভাবশালী এবং সর্বজনমান্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়স্বজনদের দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণ-তরুণী এবং যুবক যুবতীদের মধ্যে অনেকেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন এবং তারা নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই নিজের শক্ত অবস্থান পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন। ফলে এবারের সম্মেলনে রক্তের সম্পর্কীয় আত্মীয়স্বজনকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন এবং তাদের উপযুক্ত পদপদবিতে পদায়ন করা প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিরাট এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে সামান্য ভুল বা গাফিলতি করা হলে তা দলের অগ্রযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।

বর্তমান আওয়ামী লীগে অন্তত এক ডজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ রয়েছেন যারা দলীয় রাজনীতি তো বটেই, জাতীয় রাজনীতিতেও কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। সর্বজনাব আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, চট্টগ্রামের মহীউদ্দিন চৌধুরী প্রমুখকে অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সাথে মূল্যায়ন না করলে দলের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যাবে। অন্য দিকে, প্রধানমন্ত্রীর কাছের মানুষ বলে পরিচিতি পাওয়া ডা: দীপু মনি, ড. হাসান মাহমুদ, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, মাহবুব-উল-আলম হানিফ প্রমুখ নেতা কেবল প্রধানমন্ত্রীর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের জীবন, মান-সম্মান এবং বোধ-বুদ্ধির পরোয়া না করে যখন যেমন দরকার তেমনটি করেছেন এবং বলেছেন। ফলে নতুন কমিটিতে তারা যদি যথাযথভাবে মূল্যায়িত না হন, তাহলে আগামীতে দলীয় প্রধানের ইঙ্গিতে বা তার সন্তুষ্টির জন্য কেউ ঝুঁকি নেবেন না। তদ্রুপ অতীতে ঝুঁকি নেয়া নেতারাও পরিবর্তিত পরিস্থিতির চাপে স্তব্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হবেন; যা কোনো শুভ ফল বয়ে আনবে না।

সরকারের ঘনিষ্ঠ অথচ রাজনীতির মাঠে সাম্প্রতিককালে প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ব্যক্তিবর্গকে সামাল দেয়াটাও প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিশাল এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বজনাব মোহাম্মদ নাছিম, সৈয়দ আশরাফ, ওবায়দুল কাদের, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকার দুই মেয়র আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন, চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাসির, নারায়ণগঞ্জের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী প্রমুখ নেতাকে প্রধানমন্ত্রী কোন পদে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন তা চিন্তা করলে আমার মস্তিষ্কের চিন্তার একক নিউরনগুলো বিকল হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়ে।

বিগত ১/১১-র সময়ে বিতর্কিত হয়ে পড়া, দলের সবচেয়ে মেধাবী, প্রতিশ্রুতিশীল এবং শেখ হাসিনার নিজের হাতে গড়া নেতারা এবারের সম্মেলন সামনে রেখে আশায় বুক বেঁধেছেন। আলাদাভাবে নাম উল্লেখ করে কাউকে বিব্রত না করেই বলছি, সংস্কারবাদীদের দলে একীভূত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কেননা ১/১১-র ঘটনায় যাদের দায়ী করা হয়, সেসব নেতার সমপর্যায়ের নেতার বিকল্প এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগে একজনও সৃষ্টি হননি। সংগঠনকে এগিয়ে নেয়া এবং দলের অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে কাজে লাগানোর জন্য যে উন্নত নেতৃত্বের অধিকারী মননশীলতা ও মেধা দরকার, তা খুব কম লোকের মধ্যেই পাওয়া যায়, যা ‘সংস্কারবাদী’ হিসেবে পরিচয় পাওয়া প্রায় সবার মধ্যে ছিল। তা ছাড়া বিগত ৯-১০ বছরেও ছিটকে পড়া ওইসব নেতা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে অন্য কোথাও যাননি; দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি এবং নিজেদের রাজনীতি থেকে আলাদাও করেননি। এসব নেতার প্রচুর কর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ী এক বুক আশা নিয়ে সম্মেলনে কাউন্সিলর হিসেবে যোগ দেবেন এবং এক বুক আশা নিয়ে সভানেত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকবেনÑ তিনি যেন তাদের নেতাদের আবারো দলে একীভূত হওয়ার সুযোগ করে দেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সফল ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতারা এবারের সম্মেলনে দায়িত্বপূর্ণ পদপদবি পেতে যারপরনাই আগ্রহ আর আকাক্সক্ষা নিয়ে অপেক্ষা করে আছেন। মীর্জা আজম, ইকবালুর রহিম, নাজমা আকতার, নজরুল ইসলাম বাবু, লিয়াকত সিকদার প্রমুখকে নতুন কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে নেতাকর্মীরা যেমন আশা করেন, তেমনি মন্ত্রিপরিষদের নবীন সদস্যদের মধ্যে নসরুল হামিদ বিপু, শাহরিয়ার আলম, আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, তারানা হালিম এবং জুনায়েদ আহমেদ পলককে ঘিরে নেতাকর্মীদের আশা-আকাক্সক্ষা কোনো অংশে কম নয়। দলের অন্যান্য নিবেদিতপ্রাণ নেতার মধ্যে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সফল নায়ক শফি আহমেদ, অসীম কুমার উকিল, কামরুজ্জামান আনসারী প্রমুখকে নিয়েও অনেক নেতাকর্মীর ইতিবাচক আবেগ-উচ্ছ্বাস রয়েছে।

আওয়ামী লীগের ঘোর সমর্থক ব্যবসায়ী নেতারা, সাবেক আমলা, এনজিও ব্যক্তিত্ব, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, চিকিৎসক এবং শ্রমিক নেতাদের নতুন কমিটিতে স্থান করে দেয়ার চতুর্মুখী তাপ, চাপ, আবেগ-উচ্ছ্বাস প্রভৃতি ব্যাপক আকারে আবর্তিত হবে। প্রধানমন্ত্রীকে হিসাব কষতে হবে- কারা সারা বছর দলীয় অফিস পাহারা দেন এবং কারা ‘বসন্তের কোকিল’ হয়ে ক্ষণে ক্ষণে গান গেয়ে যান। কারা দলীয় অফিস ও মিডিয়ায় গলাবাজি করেন। তৃণমূলে গিয়ে জিতে আসা তো দূরের কথা বরং ওইসব লোক যদি কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালান তবে নির্বাচনে ভরাডুবি শতভাগ নিশ্চিত। অন্য দিকে, এমন অনেকেই রয়েছেন যারা ভোটারদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয় এবং যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেও দলের জন্য শতভাগ নিশ্চিত বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম। রয়েছেন ‘হাইব্রিড’ বলে নিন্দিত বিশাল একটি শ্রেণী এবং আছেন ধর্মীয় নেতারা। এ অবস্থায় সব পক্ষকে সামাল দিয়ে, সব অন্তর্নিহিত সমস্যা মাটিচাপা দিয়ে সব নেতাকর্মীর মধ্যে আশার ভাব জাগানিয়া একটি কমিটি উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী কেমন দক্ষতা দেখাতে পারবেন, তা কেবল সময়ই বলে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.